আন্দালীব’র ‘বিদূষিকার লন্ঠন’ থেকে কয়েকটি কবিতা

129287356_10157580456301039_2694506833223106469_n

এটা নিশ্চিতভাবে মেগালোম্যানিয়া যে, নিজের লেখাপত্র’কে ‘বডি অফ ওয়ার্ক’ হিসেবে বিবেচনা করে  দেখা শুরু করেছি ইদানিং। নিজের সব লেখা আমি এক জায়গায় করেছি, ‘কবিতা সংগ্রহ’ নামক সিউডো-শিরোনামে। কী দাঁড়ালো, আর কী দাঁড়ালো না, সেসব বিবেচনার বাইরেও নিজের কাজ’কে একত্রে রেখে দেখলে অনেক সময় গ্যাপগুলা সামনে চলে আসে এবং এটা পরবর্তী কাজগুলার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার করার জায়গাটা তৈরি করতেও সহায়তা করে । এতো  কথা বলছি, কারণ আন্দালীব’র ‘বিদূষিকার লন্ঠন’র পাণ্ডুলিপি পড়ে মনে হল তাঁর ‘বডি অফ ওয়ার্ক’—এ দারুণ অভিনব এক সংযোজন হতে যাচ্ছে এটা। যদিও প্রতিটা বই আসলে আলাদাই, কারণ সময় ও সময়ের ইন্টারপ্রিটেশানের জায়গায় প্রত্যেক আর্টিস্টেরই একটা স্বাতন্ত্র্যের জায়গা থাকে। তারপরও, কবি আন্দালীব’র দীর্ঘদিনের পাঠক হিসেবে একটা তুলনামূলক ইভাল্যুয়েশানের ব্যাপার চলেই আসে।

‘শিল্পের ইতিহাস তার ফর্মের ইতিহাস’— লুই আরাগঁ’র এই কথার সাথে আমি পুরোপুরি একমত না হলেও লার্জলি কথাটা ‘ঠিক’। কারণ, যত শিল্প-আন্দোলন এসেছে, তা এসেছে নতুন ফর্মে ভর করেই। আন্দালীব’র ‘টোটেম সঙ্গীত’ বই’র পরবর্তী পর্যায়ের লেখাগুলাতে আমি মাঝে মাঝে মন্তব্যও করেছি যে, এজ আ ফর্ম এই লেখাগুলা ‘টোটেম সঙ্গীত’র এক্সটেনশান বলে মনে হচ্ছিল আমার কাছে। ‘অপুষ্পক’ বইটায় সেটা কাটানোর একটা আভাস ছিল, কিন্তু এর বেশি কিছু না। এই পাণ্ডুলিপি পড়ে আমার মনে হল যে, অই ইনার্শিয়াটা প্রায় পুরোদমেই অভারকাম করা গেছে। নানান ছন্দে কবিতা লেখার ফলে শুধু নতুন ধরণের ‘টোন’ নয়, নতুন ধরণের ‘মুড’গুলা ধরতে পেরেছে এই বইয়ের কবিতা। যেমন, ‘বন্দিশ’ শিরোনামের কবিতা কয়েকটার মিষ্টি-সুরেলা এক ভ্রমণের মুডের পাশে ’এক্সিডেন্ট’ কবিতার লাইট মুড, বা ’ছন্দের মাস্টার’/ ’যন্তর মন্তর’ নামক কবিতাগুলার ফার্সিকাল মুড—এইসবের কথা মনে পড়ছে এখন।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ফর্মের পাশাপাশি অভারল এই বইয়ের কনটেন্টের বৈচিত্র্য। টোটেম/ সিম্বল নিয়ে ওনার যে কাজ এখন পর্যন্ত, সেটার দারুণ ধারাবাহিকতা আছে এইখানে—‘গজার’ , ‘চিল’ , ’বাঘের থাবার মধ্যে ‘— এইসব কবিতার ভিতর দিয়ে। ’মন্টেজুমা’ কবিতাটাও উল্লেখযোগ্য এইখানে। তবে, আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কবিতাকে ডি-হিউম্যানাইজ করার যে পরাধুনিক চর্চার মধ্যে দিয়ে অনেক সমসময়ের কবিতাকে যেতে দেখি, সেই প্রচেষ্টা এইখানে নাই। বরং ফুড-চেইনে কাঠবিড়ালীর নিচে পড়ে থাকা মানুষ, মারীর বাস্তবতায় আটকে পড়ে ক্রমশ কানিবাল হতে থাকা মিডল ক্লাস, প্রান্তিক আর মহানাগরিকের মাঝামাঝি আটকে পড়া হতচকিত মানুষদের কথা বারবার ঘুরেফিরে এসেছে নানান সময়ে। কবি যে-সময়খণ্ডে এগজিস্ট করে, সেই সময়ের কনফ্লিক্ট ও কনসিকোয়েন্স’কে ইন্টারপ্রিট করার ও ধারণ করার সবচেয়ে উপযোগী সংবেদনশীলতার অধিকারীও সে।— এইটা আমি একরকম বিশ্বাস করি। তো, সেই জায়গা থেকে এক ভয়াবহ সময়ের চিত্র কিছুটা ধরতে পেরেছে ‘বিদূষিকার লন্ঠন’। যা হোক, এইগুলা খুবই প্রাথমিক গোছের মন্তব্য। আশা রাখি, পরবর্তীতে সময়-সুযোগ করে আরো কথা বলতে পারব বইটা নিয়ে। — অমিত চক্রবর্তী

 বন্দিশ - ২ 
  
 নিহিলতা ভেঙে উঠে আসবার মত 
 জলযানটির গুঞ্জন ধরে রাখি 
 পার হয়ে এসে ঝঞ্ঝা-মুখর নদী 
 তোমার কাছেই আঁকতে দিয়েছি ক্ষত
  
 সে’ক্ষত এমন বর্ধনশীল ভাবে 
 ছড়িয়ে পড়েছে শরীর কিম্বা মনে 
 দূরে ঠেলে দিয়ে নদীটির কথকতা 
 বাষ্পরুদ্ধ জলযানখানি কাঁপে 
  
 যদি কম্পন ভুলেই ভেবেছ তারে
 দূরপাল্লার ভ্রমণের ফাঁকে-ফাঁকে 
 ট্যুর-প্ল্যান লিখে লাভ হবে না তো আর 
 পাওয়া যাবে তারে ভাবনার বিস্তারে 
  
 ভাবতে-ভাবতে দিন তো গিয়েছে চলে 
 নিষ্কাম ভাবে কামনায় গনগনে 
 চুল্লির আঁচে সেঁকে নেয়া গেল প্রেম 
 মানবিক বোধ পারমাণবিক ছলে 
  
 পরমাণু জানে ভেঙে যাওয়া কত ভাল 
 ভেঙে যাওয়া জানে বিষণ্নতার দিন 
 দু’টি পথ যেন দুই দিকে গেছে বেঁকে 
 পথের প্রান্তে বিস্ফোরণের আলো 
  
 সেই আলোতেই ঘটিয়েছি মধুরেণ 
 জলযানটির পেটের ভেতরে বসে 
 নৌপথে ঘোরা নাবিকের মত করে 
 আমাকেও লোকে ভুলতে বসেছে যেন 
  
  
 কনে-দেখা-আলো 
  
 কপিশ রঙের মেঘের ভেতর দিয়ে 
 যাচ্ছে দেখা সূর্য ডোবার ছবি 
 কনে-দেখা-আলোতে ভর করে 
 সত্য হল মিথ্যে লেখা সবই
  
 গভীর কোন জীবন-বোধের স্মৃতি 
 হাতড়ে দেখি পড়ছে না যে মনে 
 বিপর্যাসে হারিয়েছে তারা 
 সঙ্গোপনে বনের নিরজনে 
  
 সে'খান থেকে স্বয়ম্ভু এক আলো 
 ঠিকরে আসে চকমকি পাথরে 
 যে’সব কথা বৃন্দ ঋষি জানে 
 লোকের মুখে ফসিলে-মর্মরে 
  
 যন্ত্রযুগের সূচনাতে ছিল 
 রহস্যতে আটকে পড়ার জ্বালা 
 কপিশ রঙের মেঘের ভেতর দেখি 
 ডানা-ভাঙা জেপলিনের জানালা 
  
 এ’সব কিছু ঘটতে থাকে প্রবল 
 সূর্য ডোবার অল্প কিছু আগে 
 রহস্যটা ছলকে পড়তে দেখি 
 কনে-দেখা-আলোর অগ্রভাগে 
  
  
মন্টেজুমা 
  
 ধসেই গেল মস্ত প্রাসাদ আজটেকার,  
 হিস্পানীয় ব্যান্ডানাময় দস্যুটার।  
 লুটতরাজে করল এমন সর্বনাশী,  
 কাটল মাথা যোদ্ধা দলের দাস ও দাসী। 
 সঙ্গে নিল রক্তরুবির মূর্তিখানি, 
 ঝিকমিকিয়ে ওঠার আগেই দৈববাণী—
 নাজেল হল ইউরোপিয়ান ধর্ম মতে,  
 ইভানজেলি মর্মকথার নর্ম হতে। 
  
 রুবির চোখে চোখ পড়তেই আস্তে থামি,  
 টোটেম গুরু আজকে এমন মুক্তিকামী! 
 বস্তু ছেড়ে যাচ্ছেন উড়ে অবস্তুতে, 
 একেশ্বরী ধর্মাচারের এ’খুঁতখুঁতে—
 স্বভাবটিতে যারপরনাই আনন্দিত 
 হলেন গুরু সূর্য তখন অস্তমিত। 
  
 বাগানখানি মন্টেজুমার যেই ফুরাল, 
 কোত্থেকে যে আকাশ-পাতাল তীব্র আলো—
 ছড়িয়ে গেল দৃষ্টি সীমায় অভ্রভেদী, 
 উঠল কেঁপে সিংহাসনের পাষাণবেদী। 
 সেই আলোতে মন্টেজুমার ঘুম ভাঙাল— 
 বন্ধুবেশী শত্রু-জাহাজ নিকষ কালো। 
  
 রাতের শুরু পরিত্রাণের নেই হদিশ, 
 ছোট্ট পাখি রাজার কাছেই অহর্নিশ - 
 গান শুনিয়ে বলল—‘এরাই দখলদার।’ 
 ’যা দিন গেছে, ফিরবে না আর আজটেকার।’ 
  
 হাইকিং 

 মঞ্জুলিকা মঞ্জুলিকা 
 টাংস্টেনের ল্যাম্প  
 গুড়িয়ে দিল ঝঞ্ঝা-হাওয়া 
 রাতবিরেতে ক্যাম্প
 
 তার মাঝেতে লড়ছ তুমি 
 ঝোড়ো হাওয়ার গোয়ার্তুমি 
 সিগারেটের প্যাকের সাথে 
 মাচিসটাও ড্যাম্প 
 মঞ্জুলিকা খুঁজছ তবু 
 অহংকারী ল্যাম্প 

 বৃষ্টি কিছু কমছে হাওয়া 
 ফোরকাস্টে জানতে পাওয়া
 দেড়-ব্যাটারি টর্চ হারাল 
 বনভূমির হেম্প 
 মঞ্জুলিকা তোমার পায়ে 
 অলক্ষুণে ক্র্যাম্প 

বাঘের থাবার মধ্যে 
  
 হরিণ যেমন ত্রস্ত 
 বাঁচতে-বাঁচতে সবার মত ভীষণ বিপর্যস্ত 
 শিকার হতেই চাইছে 
 ছোট্ট মতন জলার ধারে বিপণ্নতায় গাইছে 
 জলার মাঝে অদ্ভুত 
 শব্দ আসে পূর্বাভাসে মিথেন গ্যাসের বুদ্বুদ 
 খাদ্যচক্রে বাঘটা 
 শীর্ষে আছে শুরুর থেকেই দৈব দুর্বিপাকটা 
 তখন থেকেই আজ যে 
 কার্নিভোররা হার্বিভোরকে এমন করে খাচ্ছে 
 তাই তো হরিণ আস্তে 
 চাইলো মরণ সামনে আসুক তখন যদি বাঁচতে 
 ইচ্ছে হয় তো অল্প 
 লিখবে আবার নতুন করে বাঁচতে শেখার গল্প 
 তখন হরিণ ছুটবে 
 জলার ধারেই যৎকিঞ্চিৎ ভোরের আলো ফুটবে 
 বাঘের থাবার মধ্যে 
 ঘুরবে জীবন এমন করে গদ্যে এবং পদ্যে 
  
  
 গজার 
  
 পানির গভীর থেকে ঘাই মেরে যায় 
 সেইসব দেখে তার কাচঘষা চোখ 
 ফোকলোর পাঠ করে জেনেছে কি হায় 
 নমিত হওয়ার ছলে শিকারের রোখ
  
 ঘন বর্ষায় কৈবর্তের দল 
 সন্তর্পনে যেন হাতে নিয়ে কোঁচ 
 বুঝি নাই কেন তারা ধরে রাখে বল 
 সেই সব কেনই-বা করে না খরচ 
  
 আচানক মেলে যদি গজারের ঝাঁক 
 জাল ফেলে কোঁচ মেরে ফুরোয় না আর 
 কিংবদন্তী ধরা যাক বা না যাক 
 রহস্যে উঠে আসে অর্ধ-শিকার 
  
 শ্যাওলার ছোপে গড়া মাংসের ওম 
 আবছায়া এঁকে যেন আঁধারে মিলায় 
 ঋতুর শরীরে রাখা এমন নরম 
 গজার কী জানে কৈবর্তের দায়  
বিদূষিকার লন্ঠন। আন্দালীব। প্রকাশক:উড়কি। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০২১।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s