মাহমুদ দারবিশের খণ্ড-কবিতা :: ইয়ার ইগনিয়াস

darbish post

মাহমুদ দারবিশ। ফিলিস্তিনের আলবিরওয়ায় ১৯৪১ সালের ১৩ মার্চ তাঁর জন্ম। মাত্র ছয় বছর বয়সেই জন্মভূমি ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে এবং তারপর থেকে শুরু হয়েছে তাঁর উন্মূল উদ্বাস্তু জীবন। কোথাও থিতু হতে পারেননি। বাইরে-বাইরে জীবন কাটলেও ফিলিস্তিন ছিল তাঁর অন্তরে এবং ফিলিস্তিনেরর স্বাধীনতার জন্য তিনি আজীবন কলমযুূ্দ্ধ চালিয়ে গেছেন। তাই তাঁকে ফিলিস্তিনের জাতীয় কবিও বলা হয়ে থাকে। আরবী সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ এই কবি ২০০৮ সালের ৯ আগস্ট টেক্সাসের হস্টনে মৃত্যুবরণ করেন।

আরবে প্রাচীন কাল থেকেই কিত্আ বা খণ্ড-কবিতার চর্চা হয়ে আসছে। সংযুক্ত লেখাগুলিও সেই ধরণের খণ্ড-কবিতার অনুবাদ বা কবিতার খণ্ডাংশের অনুবাদ। ‘অনুবাদ’ বলাও বোধ হয় ঠিক হবে না; মূল আরবী ও ইংরেজি, দুটোর মাঝামাঝি সমন্বয় রেখে কাজটা করতে চেষ্টা করেছি। তাই লেখাগুলোকে ‘ভাবানুবাদ’ বলা যেতে পারে।— ইয়ার ইগনিয়াস


ওরা তা চায়নি; অথচ আমি হয়েছি তা-ই, যা আমি চেয়েছি। এটা-ই আমার স্বাধীনতা।


মনে মনে বলি—চাঁদ ওঠার জন্য আমার ভিতরের অন্ধকারই যথেষ্ঠ। 


শোনো—”একদিনের জন্য বন্ধু হয়ো না; মাস ধরে বন্ধুত্ব হয় না। দূরে যদি যেতেই হয়, তবে কাছে এসো না। যা করতে অপারগ; তা অন্তত বলো না।” এইবার ভাব—কাছে আসবে? নাকি ওখানেই থাকবে!


যখন আমি আঁকি—সে, বাতাস হয়ে তা শুকাতে সাহায্য করে। শীতের দিনগুলোতে তার বিপরীত; সে তখন উষ্ণতা দেয়। আর অন্ধকারকে কখনও কাছে আসতে দেয় না; আলো হয়ে সর্বদা পাশেই থাকে।


আমার বর্তমান বড়ই গোলমেলে; এইসব ভুলে যেতে চাইলেও পারি না। মনে মনে বারবার বলি—স্মৃতি ভুলে যাওয়ার জন্য যদি একটা নির্দিষ্ট দিন বেছে নিতে বলা হয়; আমার জন্মের দিনটাকেই বেছে নেব।


সে : আবার কবে দেখা হবে?
আমি: যে-বছর যুদ্ধ শেষ হবে।
সে: যুদ্ধ কবে শেষ হবে?
আমি: যখন আমাদের দেখা হবে!


কবিতা সব সময়ই অসম্পূর্ণ; একটি প্রজাপতির মাধ্যমে তা পূর্ণতা পায়…!


মনছবি যদি তোমাকে দাঁড় করায়ে দেয় ব্যাটালিয়নের বিপরীতে; তবে যুদ্ধই করো।


তোমাকে ভালোবাসতে বাধ্য হয়েছি, তার কারণ তোমার খুঁতহীনতা নয়; গাম্ভীর্যতা। কী ভাবছো? বোকা! প্রেমিকের সহজাত সৌন্দর্য তো বোকামি!


আমি ফিরে আসব আমার লোকজনসহ; আলো-বায়ু-জলের সাথে মিশে, তরবারীর আঘাতে আঘাতে উদ্ধার করে নেব এই ভূখণ্ড। কিন্তু কোনো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করব না; না-হন্তারকের পক্ষে, না- ক্ষতিগ্রস্থের।


ভালোবাসি না; আবার ঠিক বাসিও সেইসব তুমুল প্রেমের কবিতা; যে-কবিতা চাঁদকে সিগারেটের ধোঁয়া থেকে রক্ষা করে।


সে হতে পারে একজন লেখক, বা শ্রমিক, অথবা শরণার্থী, কিংবা চোর, ডাকাতই হোক; প্রকৃত প্রস্তাবে কোনো পার্থক্য আছে বলে মনে হয় না।


সংযম মানে—শুধু সহবাস বা বাসনার নিয়ন্ত্রণ নয়; দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা থেকে এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।


কুয়াশা একপ্রকার অন্ধকার; খোসা-খোলা কমলার বাইরেও এক-পুরু শাদা অন্ধকার থাকে; থাকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রেমিকার মুখেও।


একই পথে হেঁটে নিজেকে বদলানো যায় না।


আমাকে মনে পড়ে? কিংবা পুরনো বাঁশিটা? ফিনিক্সের পালকের কথা মনে হলে মর্মাঘাত হয় না!


তোমার অনুপস্থিতি শীতকালকে আরও বেদনাবহ করে তোলে।


তোমার সুগন্ধির প্রতি দূর্বলতা হেতু; তোমার গোপনতাগুলি সর্পদষ্ট-ক্ষতের মতো খুঁজে যাই। শরতের উদাসী বাতাসে তোমার চুলকে তাঁবু বলে ভ্রম হয়!


প্রেমিকা যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে: তোমার কাছে আকাশ আর আমার মধ্যে পার্থক্যটা ঠিক কী? আমি তাকে বলি: পার্থক্য এটাই যে, যখন তোমাকে হাসতে দেখি, আমি আকাশের অস্তিত্বও ভুলে যাই।


যদি জয়তুনগাছ জানতো তাদের অশ্রুতে তৈল হয়! তবে রোপনকালেই লাগিয়েদের হাত ধরে রাখতো।


চাঁদ-যে সুন্দর, তার প্রধান কারণ হলো দূরত্ব।


বাতলে দেওয়া পথ নয়; নিজের মতো করে পথ তৈরি করে নেওয়াই আসল পরিব্রাজকের পরিচয়; এতে তোমার অদম্যতাও অপরিবর্তিত থাকবে।


সৌন্দর্য্যও একদিন অসহায় হয়; রঙ্গভূমিতে সদ্য ফোটা রডোডেনড্রন যেমন।


তোমার ভালোবাসাকে প্রথমে হৃদয়ে ধারণ করি; তারপর প্রবাহিত করে দিই শিরায় শিরায়।


বাঁশির সুরে কিংবা একটি গানে যেভাবে মোহিত হই, সেভাবেই তোমাকেও হয়তো ভালোবেসে ফেলেছি। আমাকে তোমার সত্ত্বার অংশ করে নাও, আর গ্রহণ করো কফির নিমন্ত্রণ। 


এই রাস্তায় আমার সাথে যদি অন্য কেউ থাকতো; তাহলে আমি আমার আবেগকে বাক্সবন্দি করে রাখতাম। যদি তাই হতো; আমার কবিতা হয়ে যেত জলের মতো স্বচ্ছ, শাদার মতো বিমূর্ত, আর আলোর ওজনের মতো গুরুত্বহীন।


আমাদের জীবন হওয়া উচিত আমাদের ইচ্ছের মতো। ছোট্ট একটা জীবন দিয়ে বললো—”এমন ভাবে যাপন কর, যাতে পুনরুত্থানের দিনে সম্মানের সহিত উঠতে পার।”


আমরা প্রত্যেকটি জিনিসের শেষপ্রান্তে এসেই বুঝতে পারি; আমরা কতোটা কূপমণ্ডূক; ভালোবাসা ভাঙার কারণও সংকীর্ণচেতা।


বাদামগাছে ফুল পর্যাপ্ত আসেনি? তাহলে হাসুন, দেখবেন নতুন ফুল ফুটতে শুরু করেছে।


জীবন স্বজ্ঞামূলক…
তবুও কেন আমরা মিথ দিয়ে জীবনকে ব্যাখ্যা করি?


জীবন সত্য; অথচ সব বিশেষণ মিথ্যে।


হৃদয় সহজে বিস্মৃত হয়। যেমন সহজ, ফাঁপা বস্তুর জলের উপরে ভাসা।


বাতলে দেওয়া পথ নয়; নিজের মতো করে পথ তৈরি করে নেওয়াই আসল পরিব্রাজকের পরিচয়; এতে তোমার অদম্যতাও অপরিবর্তিত থাকবে।


আমার নামের পাশে বিশেষণ যুক্ত হওয়ার পর থেকেই বিরক্তি মাথাচড়া দিয়েছে। সাম্প্রতিক অবস্থা এমন যে, আমার এবং ‘আমার’ মধ্যে দূরত্ব যুক্ত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়েছে।


প্রত্যেক জীবিতের সামনে মৃত্যু সমান সমান দূরে।


ভাষার আধুনিকতা বলতে কিছু হয় না; ভাষা নিরন্তর পাল্টায়। যা আজ আমরা আনন্দে উদযাপন করছি; তা-ও গত হবে। সব কিছুই তো একদিন অতীত হয়ে যাবে।

অনুবাদক-পরিচিতি:

ইয়ার

ইয়ার ইগনিয়াস। কবি ও গদ্যকার। জন্ম ১৯৯০ইং, কক্সবাজারে। বর্তমান নিবাস মধ্যপ্রাচ্যে (সৌদি আরব)। প্রকাশিত বই: হারমিসের বাঁশি (কবিতা) ২০১৯ইং। সম্পাদনা: ‘আদিঅন্ত’ ওয়েব ম্যাগাজিন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s