জেমস জয়েস’র ইউলিসিস ( পর্ব-২) :: পায়েল মণ্ডল

টেলিমেকাস

who-owns-ulysses-exhibition-feature

ইউলিসিসের প্রথম অধ্যায়কে জয়েস-স্পেশালিষ্টরা টেলিমেকাস আখ্যা দিয়েছেন।  টেলিমেকাস হলো গ্রীক বীর যোদ্ধা ইউলিসিস ও তার স্ত্রী পেনিলোপির সন্তান। টেলিমেকাস জ্ঞানদেবী এ্যথেনার স্বপ্ন-নির্দেশ পেয়েছিলেন তার বাবা ইউলিসিসকে খুঁজে বের করার জন্য, ভাবা হচ্ছিল ইউলিসিস ট্রয়ের যুদ্ধ শেষে দেশে ফেরার পথে হয়তো মারা গেছেন। জয়েসের এই উপন্যাসের একটি অন্যতম প্রধান চরিত্র স্টেফান ডেডেলাস অনবরত তার মনোজগতে খোঁজ  করে চলেছে একজন কল্পপিতার, যে-পিতা তার বায়োলজিক্যাল পিতা নয়। পক্ষান্তরে, উপন্যাসের নায়ক লিওপল্ড ব্লম খোঁজ করছে তার পুত্রকে, যে মারা গেছে শিশুকালে। দিনের শেষে স্টেফান ও ব্লুম মিলিত হয় ঘটনাচক্রে। দিন শেষে তারা মিলিত হলেও, তাদের মনজগতে একের জন্য অপরের খোঁজ যেন একটা প্রলম্বিত সময় ধরে চলে। জয়েস পাঠকদের এক সময়হীন মনস্তাত্ত্বিক জগতে নিয়ে যান। এখানে ব্লুমস যেন হারিয়ে যাওয়া ইউলিসিস আর স্টেফান তার পুত্র টেলিমেকাস। প্রথম অধ্যায়ে জয়েস যেন স্টেফান ডেডেলাসকে পাঠকদের কাছে টেলিমেকাস হিসাবেই পরিচয় করিয়ে  দেন।

সকাল আটটা প্রায়। দিন ও তারিখ অজানা। স্থান স্যান্ডিকোভ সমুদ্র সৈকত, ডাবলিন থেকে সাত কিলোমিটার দূরে, মার্টেলো টাওয়ার। ঠিক এই সময়,  এই স্থানে উপন্যাস ইউলিসিসের পর্দা ওঠে পাঠকদের জন্য। মার্টেলো টাওয়ারে স্টেফান ডেডেলাস, বাক মুলিগান ও হাইনস বাস করে। বাক মুলিগ্যান একজন মেডিক্যাল স্টুডেন্ট, হাইনস একজন অক্সফোর্ড-ছাত্র, ডাবলিনে এসেছে আইরিশ ফোকলোরের উপর পড়াশোনা করার জন্য। সে বাক মুলিগ্যান আর স্টেফান ডেডেলাসের সাথে মোর্টেলো টাওয়ারে কিছুদিন থাকার জন্য উঠেছে। স্টেফান খুব বিরক্ত হাইনসের উপর । আর তাই সে টাওয়ার ছেড়ে অন্য কোথাও যাবার কথা ভাবছে মনে মনে। জয়েস টেলেমেকাসের ইথাকা ছেড়ে যাবার সংকল্পের সাথে প্যারালাল করেছেন স্টেফানের এই মনোভাবের।

অডিসিতে টেলিমেকাস ইথাকা ত্যাগ করে তাঁর পিতা ইউলিসিসকে খুঁজে বের করার জন্য বের হন। এখানে স্টেফান ডেডেলাস টেলেমকাসের প্যারালাল, পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টা তাঁর মনোজগত একজন পিতার খোঁজ করবে। জয়েস এই উপন্যাসের কাঠামোতে ওডেসির কাঠামো হুবহু ব্যবহার না করে বরং প্রচ্ছন্ন ভাবে সেটা ব্যাবহার করেছেন  পাঠকদের মনে মহাকাব্যের প্যারডির একটা স্পেস তৈরী করার জন্য।

ওডিসি আর ইউলিসিসের মাঝে পার্থক্য এইখানে যে, স্টেফান শারীরিক ভাবে তার স্থান ছেড়ে যায় না টেলিমেকাসের মত। কিন্তু মনোজগতে যেতে চায়। স্ট্রীম অফ কনশাসনেসের জগতে স্টেফানের অবস্থান। আর টেলিমেকাস শারীরিক ভাবে স্থান ত্যাগ করে তার হারিয়ে যাওয়া বাবা ইউলিসিসের খোঁজে।

দুর্বোধ্যতম এক্সপেরিমেন্টাল উপন্যাসটির পর্দা ওঠে মার্টেলো টাওয়ারে। ক্ষণস্থায়ী মার্টেলো টাওয়ারে বাস করার অভিজ্ঞতাকে এডোপ্ট করেন জয়েস।  নেপোলিয়নের আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য শত বছর আগে টাওয়ারটি নির্মিত হয়। আট ফিট পুরু দেয়ালের টাওয়ারটির উচ্চতা চল্লিশ ফিট। টাওয়ারের ভেতরে ঘরগুলো গোলাকার, দেয়ালে ঝোলানো লণ্ঠন, উপন্যাস ইউলিসিসে জয়েস যেটাকে বলেছেন –barbicans! ঘরের ভেতর দিয়ে পেঁচানো সিঁড়ি উঠে গিয়েছে টাওয়ারটির ছাদে, যেখানে ইউলিসিসের কাহিনী শুরু হয়। ছাদ থেকে দেখা যায় সাগরতট। দক্ষিণে তাকালে স্পষ্ট দৃশ্যমান কিংস্টোন হারবার। গোগার্টি মজা করে বলতেন স্টেফান ডেডেলাস সেক্রেটারি অফ ষ্টেটের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছিল টাওয়ারটি, কিন্তু রেকর্ড বলে গোগার্টি বাৎসরিক ৮ পাউন্ডে টাওয়ারটি ভাড়া করেছিলেন। টাওয়ার-জীবন ছিল স্বাধীন, ছিল না কোন পারিবারিক নিয়ম-কানুন। জয়েসের ভাষায় মার্টেলো টাওয়ার হলো – the temple of neo-paganism! আর্থার গ্রিফিথ, জোসেফ হোন, সিউমাস ও সুলিভানের মত লেখকেরা এই টাওয়ারে আড্ডা দিয়েছেন।

গোগার্টি এবং জয়েস ছাড়াও তৃতীয় আর একজন টাওয়ারটিতে বাস করতো; এ্যাংলো-আইরিশ স্যামুয়েল ট্রেঞ্চ। গোগার্টির সাথে ট্রেঞ্চের পরিচয় হয় অক্সফোর্ডে। আইরিশ রিভাইভাল মুভমেন্টের সমর্থক। ট্রেঞ্চকে জয়েস মোটেই সহ্য করতে পারতেন না। কেনোয়িং ট্রিপ থেকে ফিরে এসে টাওয়ারে গোগার্টির সাথে থাকতে শুরু করে ট্রেঞ্চ। এই ট্রিপের পরে ট্রেঞ্চ দাবী করতো তার মত আয়ারল্যান্ডকে আর কেও চেনে না। ট্রেঞ্চের সাথে জয়েসকে পরিচয় করিয়ে দেবার সময় গোগার্টি কিছুটা বিদ্রূপাত্মক স্বরে বলেছিলেন – This is the man who intends to write a novel in fifteen years. । সে সময় গোগার্টি জানতেন না সত্য সত্যই জয়েস প্লানেট আর্থের সাহিত্য জগতকে জয় করবেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস দিয়ে এবং সেটা পনেরো বছরের মাঝেই।

গোগার্টি প্রায়ই অভিযোগ করতেন জয়েসের মায়ের মৃত্যুর জন্য জয়েস-ই দায়ী। জয়েস তাঁর উপন্যাস ইউলিসিসে গোগার্টির এই অভিযোগ খণ্ডন করেন ডেডেলাসের ভাষ্যে –Cancer did it not I. । গোগার্টির মায়ের সাথে জয়েস কথা বলতে অস্বীকার করেন, কারণ, মহিলা মনে করতেন তার পুত্রকে জয়েস নাস্তিক বানাচ্ছেন। উপন্যাস ইউলিসিসের এমন ইঙ্গিত দেন –Baddybad Stephen lead astray goodygood Malachi. । দেড় মাস আগে গোগার্টি এবং জয়েস মিলে পরিকল্পনা করেছিলেন দু’জন একসাথে টাওয়ারে থাকবেন। দুজনেই খুব উত্তেজিত হয়েছিলেন এমন পেগান হাউজের বাসিন্দা হবার স্বপ্ন দেখে। গোগার্টি অক্সফোর্ড বন্ধু বেলের কাছে বিষয়টা নিয়ে আলোচনাও করেন। কিন্তু, জয়েসের The Holy Office কবিতা গোগার্টির উত্তেজনায় ভাটা পড়ে।

The Holy Office প্রকাশের আগে গোগার্টি এবং জয়েস এক সকালে ডাবলিনের রাস্তায় হাঁটছিলেন। হঠাৎ দেখা হয় কবি ডাবলু বি ইয়েটস’র বাবা জন বাটলার ইয়েটেস’র সাথে। সেদিন দুজনের পকেটে ছিল শূন্য। জয়েস দুষ্টুমি করে গোগার্টিকে বলে বুড়োর কাছে ধার চাইতে। গোগার্টি কোন দ্বিধা না করে মিস্টার ইয়েটসকে বলেন – Good morning, Mr. Yeats, would you be so good as to lend us two shillings? মিস্টার ইয়েটস গোগার্টির এহেন আচরণে হতচকিত হয়ে পড়েন, সরাসরি না বলে দেন। মিস্টার ইয়েটস বলেছিলেন- Certainly not. In the first place I have no money, and if I had it and lent it to you, you and your friend would spend it on drink. মিস্টার ইয়েটসের এই উত্তর শুনে জয়েস তাঁর সামনে এসে বলেছিলেন-We cannot speak about that which is not. মিস্টার ইয়েটস চলে গেলে জয়েস গোগার্টিকে বলেছিলেন – He had no right to discuss the possible use of the non-existent. । মিস্টার ইয়েটসের এমন কথা বলার সঙ্গত কারণ ছিল। ইতিমধ্যে জয়েস-গোগার্টি গং ডাবলিনে মদ্যপায়ী হিসেবে নাম করে নিয়েছিলেন।

আরো কিছু মজার ঘটনা আছে গোগার্টি-জয়েসের। টাওয়ারে বাস করার শুরুর দিকের আর একটি ঘটনা। জর্জ রাসেলের ডেরায় একদিন হামলা করেন দু’জন। জর্জ রাসেল Hermetic Society নামের একটি মিস্টিক্যাল গ্রুপ পরিচালনা করতেন। মধ্যবিত্ত ক্রিশ্চিয়ান মিস্টিক ফলোয়ারদের নিয়ে গঠিত গ্রুপ। জয়েস The Holy Office কবিতায় জর্জ রাসেলকে আক্রমণ করেছিলেন। গোগার্টি এবং জয়েস হাজির হন ডসন চেম্বারে, যেখানে এই গ্রুপের সদস্যরা মিলিত হতো। দু’জন ঘরে তল্লাশি চালান। এক কোণে পেয়ে যান – yogibogeybox আর Madame Blavatsky এর অকালটিস্ট বই –Isis Unveiled! রাসেলের সিংহাসনের উপর ধূলির স্তর, ঘরের আরেক কোণে জর্জ রবার্টের বাক্স, ভেতরে রাজ্যের ভাগ্যলিপি লেখা খাম আর বেশ কিছু মহিলাদের অন্তর্বাস। অন্তর্বাস আবিস্কারে গোগার্টির সে কী আনন্দ। তার অভিযান যেন সার্থক হয়েছে। গোগার্টি একজোড়া অন্তর্বাস ঝাড়ুর মাথায় বেঁধে জন এগলিংটনের নামে একটা নোট লিখে সিংহাসনে সেটাকে স্থাপন করে। এর পরে জয়েস এবং গোগার্টি বের হয়ে যান ডসন চেম্বার থেকে। জর্জ রাসেল মনে করেছিলেন জয়েস এই অপকর্মের জন্য দায়ী।

গোগার্টির সাথে জয়েসের ঝাল-মিষ্টি সম্পর্ক ছিল। ভাই স্টনিসলাসের ডায়েরিতে পাওয়া যায়-

‘স্যান্ডিকোভের টাওয়ারে তিনি (জয়েস) খুব একটা শান্তিতে বাস করছেন না। গোগার্টির সাথে একত্রে থাকার অভিজ্ঞতা জিমের জন্য মোটেও সুখকর নয়। গোগার্টি তাঁকে টাওয়ার থেকে বের করে দিতে চান, কিন্তু তার সাহস নেই। গোগার্টি ভেবেছে এই কাজটি যদি সে করে আর ভবিষ্যতে জিম যদি সাহিত্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, নিশ্চিত জিম এটা নিয়ে লিখবেন। গোগার্টি জিমের লেখায় জ্বলজ্বলে তারা হয়ে থাকতে চান। জিম আর্থিক টানাটানির মাঝে থাকলেও টাওয়ারে থাকার জন্য খরচা বহন করছেন। জিম হয়তো বুঝতে পারছেন গোগার্টির মনোভাব, তাই তিনি চান টাওয়ার ছাড়তে হলে সেটা প্রকাশ্যেই ছাড়বেন।‘

উপন্যাস ইউলিসিসের প্রথম এপিসোড  হয়তো তাই শেষ হয় Usperper শব্দে।

এসময়ে লেখা দুটো কবিতায় দেখা যায় জয়েস গোগার্টির সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে যাচ্ছেন।

‘He who hath glory lost, nor hath
 Found any soul to fellow his,
 Among his foes in scorn and wrath
 Holding to ancient nobleness
 That high unconsortable one—
 His love is his companion.’
 -He Who Hath Glory Lost'   

কন্সগ্রেভ এই কবিতাটি পড়ে নোরাকে জয়েসের companion বলে ডাকতে শুরু করেন। অন্য আর একটি কবিতায় জয়েস সরাসরি ইঙ্গিত দেন গোগার্টির সাথে বিচ্ছেদের।

 ‘Because your voice was at my side
 I gave him pain, Because within my hand I held
 Your hand again.
 There is no word nor any sign
 Can make amend— He is a stranger to me now
 Who was my friend.’
 - Because Your Voice Was At My Side 

কবিতাটি খুব একটা ভালো না হলেও জয়েস এটাকে Chamber Musicএ সংযুক্ত করেন।

উপন্যাসটির শুরুতে দেখা যায় বাক মুলিগ্যান মার্টেলো টাওয়ারের উপর দাঁড়িয়ে দাড়ি শেভ করছে। সে স্টেফানকে উপরে আসতে বলে। স্টেফান টাওয়ারের উপরে [প্যারাপেটের উপর] যেখানে মুলিগ্যান দাড়ি শেভ করছিল, সেখানে আসতেই মুলিগ্যান তার সমালোচনা করতে থাকেন। স্টেফান মুলিগ্যানের কথার কোন জবাব দেয় না। সে আগে থেকেই খুব বিরক্ত ছিল তাদের রুমে একজন ইংরেজ ছাত্র হাইনসকে মুলিগ্যান থাকার অনুমতি দেয়ায়। হাইনস গতরাতে ব্লাক প্যান্থারের স্বপ্ন দেখে ভয়ে বার বার চেঁচিয়ে ওর ঘুম নষ্ট করেছে। টাওয়ার-বাসের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে জয়েস এডোপ্ট করেন এই কাণ্ডে।  ঘটনাটিতে ছিল এমন-

সেপ্টেম্বর ১৪, রাত। সেই রাতে টাওয়ারে একটা বিশেষ ঘটনা ঘটে। মাঝরাতে গোগার্টির বন্ধু ট্রেঞ্চ ঘুমের মাঝে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। স্বপ্নে দেখে ব্লাক প্যান্থার তাঁকে হামলা করেছে। ঘুমের ঘোরে ট্রেঞ্চ রিভলবার দিয়ে ফায়ারপ্লেসের দিকে গুলি বর্ষণ করে যে-দিকে জয়েস ঘুমোচ্ছিলেন। ঘোরের মাঝে গুলি করার পরে ট্রেঞ্চের মনে হয় প্যান্থারটি পালিয়ে গিয়েছে তাই আবার ঘুমিয়ে পড়ে সে। কিছুক্ষণ পরে আবারো দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে ট্রেঞ্চ, রিভালবার বের করে গুলি করতে উদ্যত হলে গোগার্টি তাঁকে চেপে ধরে অস্ত্র কেড়ে নেয়। জয়েস একটুর জন্য প্রাণে বেঁচে যান। জয়েস কোন বাক্য ব্যয় না করে তৎক্ষণাত টাওয়ার থেকে বের হয়ে ডাবলিনে রওনা দেন। সকালে ন্যাশনাল লাইব্রেরী খুললে ম্যাগিকে রাতের ঘটনা খুলে বলেন। জেমস স্টার্কি নামের পরিচিত বন্ধুকে দিয়ে টাওয়ার থেকে জয়েসের বাক্সপেটারা নিয়ে আসেন। এমন ভাবে শেষ হয় মার্টেলো টাওয়ার বাসের সময়। এই ঘটনাকে অমর করে রাখেন জয়েস, উপন্যাস ইউলিলিসের প্রথম এপিসোডে এডোপ্ট করেন। এই ঘটনার পাঁচ বছর পরে ট্রেঞ্চ তার রিভিলবার দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করে।

টাওয়ারের উপর থেকে সমুদ্র দেখা যায়। ওরা দুজনই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। মুলিগ্যান সমুদ্রকে মা নামে ডাকে। এই মা শব্দটি উচ্চারণ করতেই মুলিগ্যানের মনে পড়ে যায় স্টেফানের মায়ের মৃত্যুদৃশ্য। স্টেফানের মায়ের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় তার একমাত্র পুত্র স্টেফানের মায়ের আত্মার মুক্তির জন্য প্রার্থনা করতে অস্বীকার করা।  মুলিগ্যান তার ভাঙা আয়না স্টেফানের মুখের সামনে তুলে ধরে বলে যে, এই ভাঙা আয়না হলো আইরিশ আর্টের প্রতীক। ইচ্ছা করলে সে ও স্টেফান একসাথে আয়ারল্যান্ডকে প্রাচীন গ্রীসের মত শিল্পের তীর্থস্থান বানাতে পারে। পরক্ষণেই মুলিগ্যান আলোচনার বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে হাইনসকে ভয় দেখাতে বলে যদি সে আবারো তাকে কোন কারণে বিরক্ত করে। এই কথা শুনতেই স্টেফানের মনে পড়ে যায় হাইনসের বদরাগের কথা। তার ক্লাসমেট ক্লাইভ কেম্থ্রপের সাথে তার মারমুখী আচরণের দৃশ্য।

জয়েস ফোকাস করেন স্টেফান ডেডেলাসের দিকে। স্টেফান চিন্তান্বিত। সে মুলিগ্যানকে বলে, মাস খানেক আগে তার মৃত্যু পথযাত্রী মা সম্পর্কে সে খারাপ মন্তব্য করেছিল। মুলিগ্যান তার মায়ের মৃত্যুকে পশুর মৃত্যুর সাথে তুলনা করেছে। স্টেফান এটা মনে করিয়ে দিলে মুলিগ্যান বার বার এই মন্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে চায়, এবং শেষ পর্যন্ত বোঝাতে ব্যার্থ হলে সে স্টেফানকে উপদেশ দেয় অযথা এই ব্যাপারে কোন ক্ষোভ পুষে না রাখতে।

মুলিগ্যান গান গাইতে-গাইতে প্যারাপেট থেকে নিচে নামতে থাকে। কাকতালীয় ভাবে সে গাইছিলে সেই গান, যেটা স্টেফান তার মায়ের মৃত্যর আগে গেয়ে শুনিয়েছিল। স্টেফান ভাবে মুলিগ্যান হয়তো তার মায়ের মৃত্যুদৃশ্য দ্বারা প্রচণ্ড ভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ঠিক তখনই মুলিগ্যানের ডাকে স্টেফানের চিন্তার সূত্র ছিঁড়ে যায়। মুলিগ্যান তাকে নাস্তা করার জন্য ডাকে। স্টেফান নাস্তা তৈরি করার কাজে মুলিগ্যানকে সাহায্য করার জন্য রান্নাঘরে যায়। মুলিগ্যান স্টেফানকে বুদ্ধি দেয় হাইনসের কাছ থেকে কিছু টাকা খসাবার জন্য। স্টেফান মুলিগ্যানের এই প্রস্তাবে রাজী হয় না। এই সময় হাইনস জানায় দুধওয়ালী এসেছে। মুলিগ্যান ইয়ার্কি করে হাইনসকে বলে দুধওয়ালী হলো  বৃদ্ধ মা গর্গান, যে চা ও মূত্র উভয়ই বানায়। হাইনসকে উপদেশ দেয়. এই নিয়ে সে ইচ্ছে করলে আইরিশ ফোক জীবনের উপর একটা আস্ত বই লিখে ফেলতে পারে।

দুধওয়ালীকে ঘরে ঢুকতে দেখে স্টেফানের মনে হয় বৃদ্ধা মহিলাটি আয়ারল্যান্ডের একটা প্রতীক। সে লক্ষ্য করে যে মহিলাটি মুলিগ্যানকে তার চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে। হাইনস মজা করে তার সাথে আইরিশ ভাষায় কথা বলে। কিন্তু বুড়ী হাইনসের আইরিশ ঠিক মত বুঝতে পারে না। সে মনে করে হাইনস হয়তো ফ্রেঞ্চ ভাষায় তার সাথে কথা বলছে। মুলিগ্যান দুধের দাম বুঝিয়ে দিলে বুড়ী চলে যায়।

হাইনস ঘোষণা দেয় স্টেফানের চিন্তা ভাবনা নিয়ে একটা বই লিখবে। স্টেফান তাকে উল্টো প্রশ্ন করে যে, বইটি আসলেও বিকোবে কি না। হাইনস ডাইনিং রুম থেকে চলে যায়। মুলিগ্যান স্টেফানকে বকা দিতে থাকে হাইনসের সাথে কঠোর ব্যবহারের জন্য, কারণ, হাইনসের কাছ থেকে মদ খাবার টাকা আদায়ের সুযোগে ছিল, যেটা হাতছাড়া হয়ে গেলো।

মুলিগ্যান জামাকাপড় পরে স্টেফান ও হাইনসকে নিয়ে টাওয়ার থেকে নিচে নামে। তারা সমুদ্রের দিকে হাঁটতে থাকে। হাইনস স্টেফানকে তার হ্যামলেট থিওরী নিয়ে কিছু বলতে বলে। মুলিগ্যান পরামর্শ দেয় এখন এই বিষয়ে আলাপ করার উপযুক্ত সময় নয়। তারা বরং অপেক্ষা করতে পারে পান করার সময় পর্যন্ত। হাইনস বলে মার্টেলো টাওয়ার তাকে মনে করিয়ে দেয় হ্যামলেটের এলসিনর ক্যাসলের কথা। হাঁটতে হাঁটতে হাইনস আর স্টেফানের কথোপকথন চলতে থাকে। হঠাৎ স্টেফানের মনে হয় মুলিগ্যান হয়তো টাওয়ারের চাবিটা চাইতে পারে। টাওয়ারের থাকার কক্ষ স্টেফানের ভাড়া করা। হাইনস স্টেফানকে জিজ্ঞাসা করে তার ধর্ম বিশ্বাসের কথা। স্টেফান জানায় তার মুক্ত চিন্তার মাঝে ইংল্যান্ড ও ক্যাথলিক চার্চ দাঁড়িয়ে আছে প্রভু হিসাবে। আর তৃতীয় প্রভু হলো আয়ারল্যান্ড, যে তাকে বিরক্তিকর কাজে বেঁধে রেখেছে। এরই মধ্যে তারা বিচে এসে পৌঁছায়। সাগরের দিকে তাকিয়ে স্টেফানের মনে পড়ে যায় এখানে অতিসম্প্রতি একজন ডুবে মরে গিয়েছে।

হাইনস ও স্টেফান পানির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মুলিগ্যান জামাকাপড় খোলে সাঁতরাবার জন্য। সাগরে আরো দু’জন সাঁতার কাটছিল। তাদের মাঝে এক জন মুলিগ্যানের বন্ধু ব্যানন। মুলিগ্যান পানিতে নামলে হাইনস একটা সিগারেট জ্বালায়। স্টেফান বলে সে চলে যাচ্ছে। মুলিগ্যান টাওয়ারের চাবি রেখে যেতে বলে তার সাথে দুই পেনি এক পাইন্ট ড্রিংকের জন্য। মুলিগ্যান স্টেফানকে ১২ঃ৩০ মিনিটে দ্য শীপ পাব-এ দেখা করতে বলে। স্টেফান বিচ থেকে শহরের দিকে হাঁটতে থাকে আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে সে আজ রাতে মর্টেলো টাওয়ারে ফিরবে না। তার কাছে মনে হয় বাক মুলিগ্যান টাওয়ারের বাসস্থানটা দখল করে নিয়েছে। এখানেই শেষ হয় ইউলিসিসের প্রথম এপিসোড! (ক্রমশ)

প্রথম পর্বের লিঙ্ক:

জেমস জয়েস’র ইউলিসিস :: পায়েল মণ্ডল

One thought on “জেমস জয়েস’র ইউলিসিস ( পর্ব-২) :: পায়েল মণ্ডল

  1. দারুণ! ইউলিসিস নিয়ে আরো বিস্তারিত জানার আগ্রহ রয়ে গেলো

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s