সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ’র ‘ডাকা ঢাকে’ থেকে কয়েকটি কবিতা

ঢাকা ডাকে

বাগান মাত্রই জ্যামিতিক—এ’ সত্যের দিকে তাকিয়ে মনে হয় কবিতাও তেমনই এক কাঠামোবদ্ধ বিস্ময়; যা মূলত ভাষা, চিত্রকল্প, ছন্দ আর মানুষের বৌদ্ধিক চিন্তার শাসনে গড়ে ওঠে। তার শরীরভর্তি লুকোনো জ্যামিতি, কারুকার্য ও বিস্ময়। বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের কবিতা পাঠ করতে গিয়ে এ’ সব অনুভূতির মুখোমুখি হতে হলো। তাঁর কবিতা যতবারই পড়তে যাই, তা থেকে সাহিত্যরস আস্বাদনের পাশাপাশি যেন বাড়তি আরও কিছু আনন্দযোগ ঘটে। যে’ আনন্দ একটা ক্রসওয়ার্ড পাজল ভেদ, কিম্বা একটা রুবিকস কিউব মেলানোর আনন্দের সাথে অনেকখানি মিলে যায়! কেনো মিলে যায়, সে’ ব্যাখ্যায় গেলাম না। কেননা, আনন্দ অব্যাখ্যেয়। বাংলা-সাহিত্যের খোঁজ-খবর রাখেন এমন কেউ দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করবেন যে, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের মতো সক্রিয় কবি আমাদের সাহিত্যে এ’ সময়ে আর কেউ নেই। তিনি শুধু ‘সক্রিয়’ই না, তর্ক-সাপেক্ষে আমাদের সবচেয়ে শিল্পিত কবিও বটেন। বিশাল ক্যানভাস তাঁর, দেখার ও লেখার। তিনি বিদ্বান, অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী। তাঁর লেখার ছত্রে-ছত্রে সেই আভাস আমরা পাই। সুব্রত অগাস্টিনের কবিতার শব্দ-নির্বাচন থেকে শুরু করে ছন্দের ব্যবহার, প্রকরণ সব কিছু কেবল সুপ্রযুক্তই নয়, আশ্চর্য রকমের নিখুঁতও বটে।

সুবৃহৎ ক্যানভাসের কারণেই কী না; জগতের কোনো কিছুকেই তিনি কবিতার বাইরে রাখতে চাননি। যে-কোনো ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতির যে-কোনো অনুষঙ্গকেই তিনি দ্বিধাহীন ও নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন তাঁর কবিতায়। আমাদের সাহিত্যে এমন ঔদার্য কয়জনার! ভূগোল ভেঙেচুরে তুলে আনা বিচিত্র ও অপ্রচল অনুষঙ্গের সমাহারে তাঁর কবিতা এক স্বতন্ত্র মেজাজ পেয়েছে, সাথে পাঠক পেয়েছে নতুন দিশা! ছন্দে অবিশ্বাস্য দক্ষতা, আর সেই সাথে তাঁর উইট এবং একেবারেই নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি—সমসময়ের প্রায় সকল কবির চেয়ে স্বতন্ত্র করে তুলেছে তাঁকে। ফলে, এ’কথা বলাই যায় যে, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের এক নিজস্ব ঘরানার সাহিত্য চলে আসছে গত কয়েক দশক ধরে। নিমগ্নতা ছাড়া এমন কাব্যভাষা, এমন ভাষিক দক্ষতা কারও আয়ত্তে আসবার কথা নয়। সে’দিক থেকে বলতে গেলে আমাদের সবচেয়ে ‘নিমগ্ন’ কবিটির নামও সম্ভবত ‘সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ’ই তবে, অবাক হতে হয়, যখন দেখি—সমসময়ের ‘সবচেয়ে’ সক্রিয়, শিল্পিত, বিদ্বান কবি হওয়া সত্ত্বেও, সবচেয়ে কম আলোচনা হয়েছে তাঁকে নিয়েই। তাঁর সাহিত্য নিয়ে যা-কিছু কথাবার্তা পড়ি বা শুনি আজকাল, সে’সবও কেনো যেন অকারণ বক্রকথা, কিম্বা নানান ব্যাজস্তুতিতে পরিপূর্ণ। তবে, বাংলা কবিতার নিবিষ্ট পাঠকমাত্রই জানেন, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের সাহিত্যের পরিমাপে তাঁর জন্য কোনো স্তুতিই যথার্থ নয়। আমাদের সাহিত্যে শৈলশিখরের মতই তিনি মাথা উঁচু করে জেগে থাকবেন চিরকাল। তাঁর প্রতিটি গ্রন্থের জয় হোক!—আন্দালীব

 
 টনেস
  
 আমি খাটো হচ্ছি, নাকি মাটি আসছে উঠে?
 নাড়ার আড়াল আরও সুনজর-কাড়া,
 যা নাড়ালে... কথাটা আগের লাইনে থাকা
 সদরকারি ছিল, যথা কল্কেতু দাদারা
  
 করে— এনজ্যামমেন্ট; আমরা নেড়ে বাঙালেরা
 ওভাবে বলি নে, অত ঘিরিঙ্গি। কামচোর,
 সৈলতাটা কোনহানে? সুধা মোম-কি খাওয়া যায়?
 বৈন্টা তোরে দাদা কয়, না ডাকে বাঞ্চোত?
  
 আছছ বিন্দাস, মামদা, ষাটের বালাই
 নাইক্কা, খালি পিনিক। কানের মশা নাকে
 হাঁচির ধমক খায়া টাকে। আগে ভাগে
 সাইক্লে লম্বু অসহ্য-মিজান, কিন্তে যায়
  
 শর্করা-মাসুদ-লাগি গাঞ্জা আর ফেন।
 শান্তনু, আসিয়ো কালি, অসীমদা এসবেন।
  
  
 ক্যাফে ম্যাঙ্গো
  
 ব’সে আছি জন্মান্ধ চিল, মা-মেয়ে একত্রে দিললাগি
           রাজহংসী আসে না।
 ধানমণ্ডির ঝিল মরু-ঝিলমিল
 শাপলা-পদ্ম কিছু ভাসে না।
  
 অতঃপর ভূকম্পন ঝঝঞ্ঝন মমন্থন
 ফোন্নং খাব ফোন্নং খাব বাচ্চা জুড়ল চিচিৎকার
 যায় যায় দিন যায় যায় রাত
           আমারে সে ভালবাসে না।
  
 নাকি তবু বাসে, মা-মেয়ের পাশে, একতলা-দোতলা?
 কত পুরাতন এই শেরাটন, আগে নাম ছিল ইন্টারকন,
 লবিতে নামল বাদল, ধুয়ে গেল মাস্কারা,
 ভেসে গেল মাস্ক, নুহের বুহিতে
 উঠল একজোড়া উদাম এলিয়েন
           উদয়ন ও বসন্তসেনা।
  
 এক গ্রীনরোডে দেখা হ’ল দু’জনার
 ম্যাংগোতে হ’ল পরিচয়,
 আসছে আষাঢ় মাস…
  
 এত রক্ত!
 এ-বধ্যভূমির কে মালিক?
 উঁচু মেঘ— নিচু বজ্র। তোমার কপোলের উড়ো-চুল,
 চোখে তীব্র ঘৃণার অনিমেষ। নর-
 হত্যানিপুণ নখে বিজলি-ঝলক।
  
  
 ধানমণ্ডিতে হত্যাকাণ্ড
  
 হঠাৎই আমরা গিয়ে পড়লাম এক কথাকলি নাচে।
 ঝিলের ধারে হাঁটছিলাম। বাদামওয়ালারা কই সব।
 নাকি চটপটিই খাবা। এই যে ঘোরালে পরে পটপট
 বাজনা-বাজা খেলনাগুলি, এখনও আছে। কী আজব।
 একটা দেন তো। কত দাম। কাকে দিবা। আমাকেই।
 ফারমগেট ক্যামতে যামু জিগাতে গেছি- যাকে- 
 তার পিঠে হিত্তি লিপিতে লেখা- কিছু- জানো নাকি
 মানে এর। সন্ধ্যা হয়-হয়। সন্ধ্যা। এক রক্তাক্ত তামাশা।
 লোকটা ঘুরল। হাতে- ওহ্। তোমাকে মাঝখানে ধ’রে
 রাখি। রাত নেমে এল সব দিকে। বিশাল-সব মুখোশ
 নানা ভঙ্গিতে জ’মে আছে কেবল তোমার একটা তুড়ির
 অপেক্ষায়। সবগুলি কাচের দৃষ্টি আমার বুকপকেটে।
 পটপট। 
    
ডাকা ঢাকে। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। প্রকাশক:বৈভব। প্রকাশকাল: মার্চ, ২০২১

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s