জেমস জয়েস’র ইউলিসিস (পর্ব-৩) :: পায়েল মণ্ডল

ulysses-174

টেলিমেকাস: উপন্যাস ইউলিসিস’র শুরুটা এমন একজন চরিত্র দিয়ে, যে উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র নয়, বরং প্রধান চরিত্র স্টেফান ডেডেলাসের কন্ট্রাস্ট ও বাক মুলিগ্যান। প্রথম দৃশ্যে আমরা স্টেফান ডেডেলাস ও বাক মুলিগ্যানকে পাই। এই দুই চরিত্র হলো একে অপরের প্রায় বিপরীত। স্টেফানের চরিত্রকে প্রথম দৃশ্য থেকে ফুটিয়ে তুলবার জন্যই হয়তো জয়েস মুলিগ্যানকে কন্ট্রাস্ট হিসাবে ব্যবহার করেছেন।

স্টেফান ডেডেলাস প্যারিস থেকে পড়াশোনা শেষ করে ডাবলিনে ফিরেছে। ইউলিসিসে আমরা দেখি স্টেফান একটা স্কুলে শিক্ষকতা করছে। জয়েস ডেডেলাস নামটা নিয়েছেন গ্রীক পৌরাণিক কাহিনী থেকে। গ্রীক মিথে ডেডেলাস হলো একজন স্থপতি, যাকে রাজা মিনোস দায়িত্ব দেন ল্যাবিরিন্থ বানানোর জন্য। ল্যাবিরিন্থ হলো গোলক ধাঁধাঁময় স্থাপনা, যেখানে কাউকে রাখা হলে তার ওখান থেকে বের হয়ে আসাটা প্রায় অসম্ভব। মিনোস তার রাণীর পুত্রকে বন্দি রাখার জন্য ল্যাবিরিন্থ বানানোর আদেশ দিয়েছিলেন। স্থপতি ডেডেলাস তার পুত্র এবং নিজের জন্য বানিয়েছিলেন একজোড়া পাখা ক্রীটস দ্বীপ থেকে উড়ে পালানোর জন্য। জয়েস স্টেফানের ধর্ম, জাতীয়তাবাদ এবং রাজনীতি থেকে পলায়নপর মনোভাবকে বোঝানোর জন্য হয়তো স্টেফেনের নামের সাথে ‘ডেডেলাস’ জুড়ে দেন।

জয়েস ইউলিসিসে মহাকাব্যিক প্যারোডির মেজাজ সৃষ্টি করার জন্য মহাকাব্যের বেশ ক’টি উপাদান সমান্তরাল ভাবে ব্যবহার করেছেন। ওডিসির ইথাকার প্যারালাল হলো মর্টেলো টাওয়ার। বাক মুলিগ্যান আর হাইনস ওডেসির দুই চরিত্র – এ্যান্টিনোমইউবিমেকোস’র প্রতিরূপ। এরা দুজন অনবরত চেষ্টা করে ইথাকার ক্ষমতা হাতিয়ে নেবার। স্টেফানের মনোজগতে একটা আশঙ্কা বারবার উদয় হয়, তা হলো বাক মুলিগ্যান ও হাইনস যেন স্টেফানের ভাড়া করা টাওয়ারের বাসস্থানকে দখল করতে যাচ্ছে। শেষ দৃশ্যে মুলিগ্যান ঘরের চাবি চাইলে স্টেফানের মনে ওই ধারণা আরো বদ্ধমূল হয়।


জয়েস প্রতিটা এপিসোডে ভিন্ন ভিন্ন কাহিনীসূত্র আর চরিত্রদের ভিন্ন মনোজগতকে এঁকেছেন। আপাত দৃষ্টিতে এক এপিসোড থেকে অন্য এপিসোডের এই ভিন্নতা শুরুতে খাপছাড়া মনে হলেও পাঠ যত এগোয় গল্পগুলো একে অপরের সাথে একটা মেলবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়। তখন আর এটা মনে হয় না যে, ইউলিসিসে কাহিনীকে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হতে কোনো এনার্কি আছে। জয়েস এই উপন্যাসের একটি শব্দও মনে হয় না বিনা কারণে লিখেছেন। এমনকি ইডিয়োসিনক্রেটিক শব্দগুলোও। ইউলিসিসে ব্যবহৃত ইডিওসিনক্রেটিক শব্দগুলো ধ্বনি সৃষ্টি করার জন্য ব্যবহার করেছেন। জয়েস ভেবে চিন্তেই ঐ শব্দগুলো বানিয়েছেন। এখন গবেষকরা শব্দগুলোকে সিম্ফোনির স্বরলিপিতে ফেলে এটা বের করতে চাইছেন যে, ঐ শব্দগুলো কতটুকু সঙ্গীতময় এবং তা কেমন ভাবে বর্ণিত ঘটনাকে রিলেট করে।

এপিসোড -১, বা টেলিমেকাসকে আমরা স্টেফানের পরিচয় পর্বের এপিসোড বলতে পারি। উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্রকে স্পষ্ট করে আঁকতে যেয়ে জয়েস আরো দু’টি চরিত্র এই এপিসোডে এনেছেন। একজন হলেন বাক মুলিগ্যান আর অন্য জন হাইনস। এই দুইজন মানুষই স্টেফানের বিপরীত চরিত্রের। তাদের একে ওপরের সাথে কথোপকথন আর চিন্তার প্রবাহের মাঝে পাঠকদের মনে প্রটাগোনিস্ট যে স্টেফান সেটা এই এপিসোড থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইউলিসিসের পর্দা ওঠে কাহিনীর মাঝামাঝি থেকে, যেমনটা মহাকাব্য গুলোতে আমরা দেখি। স্টেফান ডেডেলাসকে জয়েস আগেই তাঁর পাঠকদের সামনে হাজির করেছিলেন আর একটি উপন্যাস  আ পোর্ট্রেট অফ দ্যা আর্টিস্ট এজ এ ইয়ংম্যান-এ  যার ফলে তিনি ইউলিসিসে প্রটাগোনিস্টের অতীত বর্ণনা করেন না। তিনি ধরেই নিয়েছেন পাঠকরা ইউলিসিস পাঠ করার আগে ইয়ংম্যান পড়ে নিয়েছেন। এটা জয়েসের একটা চমক।

ইউলিসিসে জয়েস স্টেফানকে নতুন ভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরেন। এই স্টেফান ইউলিসিসে তার ননব্যায়োলজিক্যাল পিতার খোঁজ করছে। স্টেফান ইউলিসিসে বেড়ে ওঠে শুধুমাত্র বর্ণনাকারীর বর্ণনায় নয় বরং তার মনোলগে, চিন্তার প্রবাহমানতায়। চিন্তার প্রবাহমানতায় বেরিয়ে আসে স্টেফানের মনোজগতের চিত্র। আমরা রক্ত-মাংসের স্টেফান ও ভাবজগতের স্টেফান উভয়কেই পেয়ে যাই। জয়েস এখানেই একজন অনন্য লিখিয়ে, যে পাঠকদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন চরিত্রগুলোর বাহির ও ভেতর’কে। মায়ের মৃত্যুতে স্টেফানের প্রার্থনা না করা, আর তার পরে তার মনোজগতে ভর করা পাপবোধ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। অবসেসড স্টেফানকে জয়েস এমন ভাবে ভাবান –

Pain, that was not yet the pain of love, fretted his heart. Silently, in a dream she had come to him after her death, her wasted body within its loose brown graveclothes giving off an odour of wax and rosewood, her breath, that had bent upon him, mute, reproachful, a faint odour of wetted ashes. Across the threadbare cuffedge he saw the sea hailed as a great sweet mother by the wellfed voice beside him. The ring of bay and skyline held a dull green mass of liquid. A bowl of white china had stood beside her deathbed holding the green sluggish bile which she had torn up from her rotting liver by fits of loud groaning vomiting.

চিন্তার প্রবাহের বর্ণনাটাও কী কাব্যময়! জয়েস পাঠকদের চোখ-কান, এমনকি ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে সক্রিয় করে দেয় তাঁর বর্ণনাকে আত্মস্থ করে নেবার জন্য। পাঠকরা যেন স্টেফানের মায়ের মৃত্যুদৃশ্যে স্টেফানের অনুভূতি নিয়েই উপস্থিত থাকে।

প্রথম এপিসোড থেকেই জয়েস ছেড়ে যান এ্যলিয়েনেশনের চিহ্ন। মার্টেলো টাওয়ারে বসবাসরত তিনজন চরিত্র ভিন্ন মন ও মানসিকতার। তাদের চিন্তার জগতে তারা কোথাও একে অপরের কাছাকাছি নয়।

স্টেফান ডেডেলাস নিজেকে মুক্ত চিন্তার আধুনিক মানুষ ভাবে। সে ধর্মকেও অস্বীকার করতে চায়। আর তাই মায়ের মৃত্যুর আগে তার আত্মার মুক্তির জন্য প্রার্থনা করতে অস্বীকার করে। স্টেফানের সাথে মর্টেলো টাওয়ারে থাকা দ্বিতীয় ব্যক্তি হলো বাক মুলিগ্যান। বাক মেডিক্যালের ছাত্র। সে স্টেফানের একেবারে বিপরীত। সে একজন অগভীর মনের মানুষ। সে সব সময় পরের সমালোচনায় ব্যস্ত। এমনকি স্টেফান ডেডেলাসের নাম নিয়েও তাকে সমালোচনা করতে দেখা যায়। নাম নিয়ে সে স্টেফানকে আক্রমন করে এমন ভাবে:- The mockery of it! He said gaily. Your absurd name, an ancient Greek!

মুলিগ্যান স্টেফানকে আক্রমণ করে তার মায়ের মৃত্যুর সময় প্রার্থনা না করার জন্য। মুলিগ্যান এমন কথাও বলতে ছাড়ে না যে, তার ফুপু স্টেফানের মত মানুষের সাথে মিশতে মানা করেছে। স্টেফানকে নিজের মায়ের হত্যাকারী বলতেও দ্বিধাবোধ করে না। স্টেফানের প্রতি মুলিগ্যানের এমন সব আক্রমণাত্মক বক্তব্য পাঠকদের স্পষ্ট ধারণা দেয়, এই দুই চরিত্রের এক বিশাল মানসিক দূরত্বের।

মর্টেলো টাওয়ারের তৃতীয় বাসিন্দা হলো হাইনস। সে একজন বখে যাওয়া ইংরেজ ছাত্র। আয়ারল্যান্ড সম্পর্কে তার ধারণা ঋণাত্মক। স্টেফানের সাথে তর্ক করে সে এটা বোঝাতে চায় যে, বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীন সত্তা আক্রান্ত নয়। হাইন ইতিহাসকে এর জন্য দায়ী করে।

মর্টেলো টাওয়ারে এক ছাদের নীচে বসবাসরত তিনজন মানুষ মানসিক ভাবে অনতিক্রম্য দূরে বাস করে। তারা শারীরিক ভাবে কাছাকাছি বাস করলেও মানসিক এ্যালিয়েনেশনে তাদের বাস। জয়েস প্রথম এপিসোড থেকেই ছেড়ে যাচ্ছেন জয়েসীয় এ্যালিয়েনেশনের সিগনেচার। মর্ডান মানুষদের এ্যালিয়েনেশন মর্ডানিস্ট লেখনীতে।

জেমস জয়েসের স্মৃতিতে ছিলো অফুরান শব্দভাণ্ডার। সেই সময় ইয়োরোপে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি ছিলো না যার স্মৃতিতে এত শব্দ জমা ছিল। জয়েসের আর একটা অসাধারণ গুণ ছিল যে, তিনি কোনো কিছুকে বর্ণনা করতে খুব দ্রুত সঠিক শব্দ স্মৃতি থেকে বের করে আনতে পারতেন। যে মানুষ দিন ও রাতের অধিকাংশ সময় মদের ঘোরে থাকতেন, তাঁর স্মৃতি থেকে কেমন ভাবে এত দ্রুত শব্দ বের হয়ে আসতো তা আজো বিস্ময়। মনোবিজ্ঞানীরা একটা গবেষণায় বের করেন যে, স্কেটযোটাইপ মানুষেরা অসাধারণ প্রতিভাবান হন। জয়েসও এক জন স্কেটযোটাইপ ব্যাক্তি ছিলেন।

জয়েস ভাষার কৌলীন্য ভেঙ্গে নতুন ভাষা বানিয়েছেন। আর তাই তাঁর ইমেজারিগুলোও অসাধারণ অথবা বলা চলে এমন ইমেজারি, যা পাঠকরা আগে কোনো লেখকের লেখায় দেখেননি। জয়েসের ইমেজারিগুলো পাঠকের কাছে তাঁর লেখাকে শুধু মাত্র চিত্রময় করে না বরং শ্রুতিময়তা সৃষ্টি করে সমান ভাবে। পাঠকদের কাছে শুধু দুই ভাবে জয়েসের ইমেজ কাজ করে না বরং সেগুলোর মাধ্যমে জয়েস তাঁর ক্ষুরধার হিউমার দিয়ে পাঠকদের মনকে রাঙিয়ে দেন । জয়েসের ইমেজারি শুধু লেখকের বর্ণনাতে বর্ণিত হয় না বরং তিনি চরিত্রগুলোর মনোলগেও যথেচ্ছা ইমেজারি ব্যবহার করেন। এটা জয়েসের ইমেজারির সিগনেচার। তিনি যেন ওই ইমেজারি দিয়ে চরিত্রদের মনের গ্রাফ আঁকেন। এখানেই জয়েস থেমে থাকেন না। তাঁর ইমেজারি গদ্যকে যেন কাব্যে পরিণত করে।

স্টেফেনের মায়ের মৃত্যুদৃশ্যকে জয়েস যখন এমন ভাবে বর্ণনা করেন স্টেফানের মনোলগে, পাঠকরা যেন মনে করতে থাকেন যে তারা সশরীরে সেখানে উপস্থিত। চন্দনের আর মোমের গন্ধ যেন পাঠকদের নাকে এসে লাগে।

Silently, in a dream she had come to him after her death, her wasted body within its loose brown graveclothes giving off an odour of wax and rosewood, her breath, that had bent upon him, mute, reproachful, a faint odour of wetted ashes. Across the threadbare cuffedge he saw the sea hailed as a great sweet mother by the wellfed voice beside him. The ring of bay and skyline held a dull green mass of liquid. A bowl of white china had stood beside her deathbed holding the green sluggish bile which she had torn up from her rotting liver by fits of loud groaning vomiting.

(ক্রমশ)

দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s