জেমস জয়েস’র ইউলিসিস (পর্ব-৪) :: পায়েল মণ্ডল

R9f33732319fe1b9f0775e45c63d3657c

এপিসোড-১ (টেলিমেকাস):: স্টেফানের মায়ের মৃত্যুদৃশ্য আসলে জয়েসের নিজের মায়েরই মৃত্যুদৃশ্য। জয়েস তাঁর নিজের মায়ের মৃত্যুর আগে বারবার অনুরোধ করার পরেও মৃত্যুশয্যার পাশে হাঁটু গেড়ে ক্যাথলিকমতে প্রার্থনা করেননি। সাল ১৯০৩, আগস্ট ১৩, এই দিনে মে জয়েস অনন্তলোকে যাত্রা করেন মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়েসে।  জীবনের শেষ সময়ে তিনি কোমায় ছিলেন। পুরো পরিবার তাঁর মত্যুশয্যার  পাশে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করেন, শুধু দু’জন ছাড়া, বড় ছেলে জেমস জয়েস এবং মেজ ছেলে স্টানিসলাস জয়েস। মামা জন ম্যুরে দু’জনকে বারবার অনুরোধ করেন মায়ের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করার জন্য। কিন্তু তাঁরা নির্বিকার থাকেন। গ্লাসনেভিন সেমিট্রিতে সমাহিত করার সময় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। জন জয়েস গলা ফাটিতে বিলাপ করতে থাকেন এই বলে – ‘I’ll soon be stretched beside her! Let Him take me whenever he likes!‘   নিঃসন্দেহে জন জয়েসের এই শোকপ্রকাশ ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু, ছেলে স্টানিসলাসের কছে মনে হয়েছিল সেটা পুরোটা লোক দেখানো। বাবাকে ভিড় থেকে টেনে নিয়ে হুমকি দেন স্টানিসলাস লোকদেখানো শোকপ্রকাশ বন্ধ করার জন্য। তখনো স্টানিসলাস বাবা জন জয়েসের কয়েকদিন  আগে রাতে তার মায়ের ঘরে ঘটানো তাণ্ডবের কথা ভুলতে পারেননি। জন জয়েস বুঝতে পারেন ছেলেরা বড় হয়ে গেছে, তারা আর তাকে ভয় পায় না। স্টানিসলাসের হুমকিতে কিছুক্ষণ নীরব থেকে শুধু এই কথা বলেছিলেন–   ‘You don’t understand, boy!’  

মার্গারেট এবং জেমস মাঝ রাতে  মায়ের আত্মা (Holy Ghost) দেখেন বলে দাবী করেন।  মার্গারেট সবাইকে বলে যে, সে মৃত মাকে দেখেছে বাদামী কাফনে মোড়া, যে কাফনে তাকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। মায়ের হলি ঘোস্ট দেখার অভিজ্ঞতা ভাই জয়েস তাঁর মহান উপন্যাস ইউলিসিসে অমর করে রাখেন এই ভাবে– ‘Silently, in a dream she had come to him after her death, her wasted body within its loose brown graveclothes . . .!’  

মে জয়েসের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে আসে অস্বস্তিকর নীরবতা। সবচেয়ে বেশী শোকার্ত হয় ছোট মেয়ে ম্যাবেল, যার বয়স তখন মাত্র নয় বছর। ভাই জেমস (Chales Patrick)  ছোটবোনকে বোঝায় কান্না না করে মায়ের জন্য প্রার্থনা করতে, তিনি বলেন – ‘You must not cry like that because there is no reason to cry. Mother is in heaven. She is far happier now than she has ever been on earth, but if she sees you crying it will spoil her happiness. You must remember that when you feel like crying. You can pray for her if you wish, Mother would like that. But don’t cry any more!’   কিছুদিন পরে মৃত মায়ের ক্লসেট থেকে একগুচ্ছ চিঠি আবিষ্কার করেন জেমস। মাকে লেখা বাবার প্রেমপত্র। বাগানে গিয়ে গোপনে পড়তে গিয়ে ধরা পড়েন ভাই স্টানিসলাসের হাতে। স্টানিসলাস চিঠিগুলো না পড়ে পুড়িয়ে ফেলেন।

মা মে জয়েসের মৃত্যুর এক মাস পরে স্টানিসলাস ডায়েরি লেখেন– 

‘জিম একজন জিনিয়াস। আমার বলা বিশেষণ ‘জিনিয়াস’ শব্দটা হয়তো তাঁর জন্য ঠিক নয়, তিনি হয়তো এর চেয়েও বড় একজন মেধাবী মানুষ। ছোটবেলা থেকে তাকে দেখে আসছি, একসাথে খেলাধুলা, পানাহার, এমন কি একই ঘরে ঘুমোনো! ওর প্রতিটা অভিব্যাক্তি আমার পরিচিত। ওর পরিবর্তন আমার চোখের সামনেই ঘটেছে, আমার থেকে কে ওকে বেশি জানে? সেই সব বিজ্ঞানীদের বড় বিজ্ঞানী বলা হয়, যারা মহাশূন্য ভ্রমণ না করেই চন্দ্র, সূর্য, তারাদের গতিবিধি নির্ভুলভাবে বলে দেন। তাঁরা তাঁদের কল্পনাকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে প্রকাশ করেন।  আমার ভাই জয়েস, তিনিও কল্পনার জগতে বাস করেন, তাঁর চারপাশের দেখা দৃশ্য, ঘটে যাওয়া ঘটনা অসাধারণ কল্পনার মিথস্ক্রিয়ায় প্রকাশ করেন সাহিত্যের অপরূপ সৌন্দর্যে।  কিন্তু, কবিসত্ত্বার বাহিরে তিনি আত্মমগ্ন আত্মমন্যতায়। তিনি নিজের অধ্যয়নের গভীরতা নিয়ে প্রচণ্ড অহংকারী একজন মানুষ। এত কিছু সত্তেও জেমস জয়েস নিঃসন্দেহে অসাধারণ নৈতিক শক্তির মানুষ। প্রতিটি লেখায় তিনি প্রমাণ করেন তিনি একজন সাহসী লিখিয়ে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস একদিন জেমস জয়েস আয়ারল্যান্ডের ‘রুশো’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। জয়েস স্টানিসলাসের ডায়েরি পড়েছিলেন। জয়েস মন্তব্য করেছিলেন শুধুমাত্র ‘নৈতিক শক্তি’ তাঁর মনোজগতকে বর্ণনা করার জন্য যথেষ্ঠ নয়, একজন কবি লেখেন ভাষার অপার সৌন্দর্যবোধ থেকে তাঁর তীব্রতম বিচ্ছিন্নতাকে ভেঙ্গে ক্রমে বিস্তারিত হন অজস্র সত্তার মাঝে।  কবি এমনভাবেই নিজেকে কাব্যমেধাবী করে তোলেন।

মায়ের মৃত্যুর পরে জয়েস কিছুদিনের জন্য লক্ষ্যহীন হয়ে পড়েন। একধরনের শূন্যতাবোধে গ্রাসিত হন। মায়ের মৃত্যুতে ক্যাথলিকমতে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা না করলেও, শোকপ্রকাশের জন্য কালো স্যুট পরিধান করেন জয়েস, হ্যামলেটের মত, ব্যতিক্রম শুধু তাঁর কোনো ভিলেন চাচা ছিল না। পনেরো দিন শোকপ্রকাশের পরে কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেন জয়েস। ন্যাশনাল লাইব্রেরি থেকে প্রচুর বই সংগ্রহ করেন তিনি। সেপ্টেম্বর ৩ নভেম্বর ১৯ তারিখের মাঝে চৌদ্দটি রিভিউ লেখেন। Daily Express  পত্রিকা তাঁর এই চৌদ্দটি রিভিউ ছাপে। আড্ডায় লিখিয়ে বন্ধু কলাম তাঁর একটি রিভিউ’র প্রশংসা করলে জয়েস তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন – ‘I received for it thirty shillings which I immediately consecrated to Venus Pandemos.’  পরিণত বয়েসে কলামের সাথে আর এক  আড্ডায় জয়েস রকিকতা করে বলেছিলেন ‘I believe you have been saying in America that you are the only person who had never lent me money. Permit me to remind you that I owe you ten shillings!’

উপন্যাস ইউলিসিসে মায়ের মৃত্যুদৃশ্যকে জয়েস কাব্যিকভাবে এঁকেছেন হয়তো একটা অপরাধবোধ থেকে। এই দৃশ্যে ইমেজারির মুভমেন্ট আছে। ইমেজারিগুলো সাদামাটাভাবে ব্যবহার করা হয়নি। সিনেমাটোগ্রাফির শর্টের মত তিনি যেন ইমেজারিগুলোকে জুম করেছেন ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যকে একটা ক্যানভাসে দেখানোর জন্য। তিনি ওয়াইড এঙ্গেল থেকে জুম করে পাঠকদের নিয়ে আসেন ঘরে, যে ঘরে স্টেফানের মা মৃত্যুশয্যায়।

স্টেফানের মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের ঘরটা যেন এক চিলতে বাঁকা সাগর, যার দিগন্তরেখা যেন রাশি রাশি ফিকে সবুজ জলের আঁধার [The ring of bay and skyline held a dull green mass of liquid] । পরক্ষণেই জয়েস সাগরের দিগন্ত থেকে পাঠকদের মায়ের বিছানার সামনে এনে হাজির করেন [ A bowl of white china had stood beside her deathbed holding the green sluggish bile which she had torn up from her rotting liver by fits of loud groaning vomiting]। জয়েস হলো কোয়ার্কি জিনিয়াস, আর তাঁর ইমেজেরির মুভমেন্টাও ‘কোয়ার্কি’ পাঠকরা যেন ধারণা করতে পারে না পরের মুভমেন্টটা কী হবে।

সাগর আইরিশদের কাছে জীবন ও মৃত্যুর প্রতীক। আয়ারল্যান্ড সাগর দিয়ে ঘেরা একটা দ্বীপ। তাদের জীবনের সুখ-দুঃখের সাথে সাগর নিবিড় ভাবে জড়িত। আর তাই সাগরের ইমেজ চলে আসে জয়েসের কলমে। আবার পরক্ষণেই মৃত্যুদৃশ্যের ঘরে নিয়ে আসেন। মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের বিছানার পাশে সাদা [white china] বাটির ইমেজ ব্যবহার করেন জয়েস। এই মাস্টার ইমেজারের ইমেজ- A bowl of white china শুধুমাত্র বাটির রঙ না, বরং তা মায়ের কফিনের রঙও বটে। জয়েসের এমন অনেক মাল্টিমিনিংড ইমেজ ইউলিসিসে ব্যাবহার করেছেন।

সাগর আইরিশদের জীবন ও জীবিকার সাথে একাকার হয়ে আছে। আর তাই ইউলিসিসে সাগর বারবার ফিরে এসেছে উপন্যাসটির বিভিন্ন এপিসোডে। সাহিত্যের সবচেয়ে কারুকার্যময় মনোলগ জয়েস সাগরতীরে বর্ণনা করেন [এপিসোড-৩-এ]। এছাড়া, যেহেতু ইউলিসিস ওডেসির প্যারোডি, সাগর বাদ দিয়ে কি ইউলিসিস কল্পনা করা যায়?

জয়েস পাঠকদের সামনে সাগরকে দেখাচ্ছেন এমন ভাবে–

“Isn’t the sea what Algy calls it: a great sweet
mother? The snotgreen sea. The scrotumtightening sea.”

জয়েসের ইমেজ যেন তাঁর মতই আনপ্রিডেক্টিবল। মাত্র তিনটা বাক্যের মাঝে তিনি তিন রকমের ইমেজ ব্যবহার করছেন যার ভিন্নতা পাঠকদের ধন্ধে ফেলে দেয়। জয়েস এমনই, তাঁর এই পাগলপনা পাঠকদেরও পাগল বানিয়ে ছাড়ে।

“Isn’t the sea what Algy calls it: a great sweet mother? – সাগরকে ‘মা” বলে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। আর সেই সাগরের রঙকে বর্ণনা করেছেন – “The snotgreen sea” নাকের বোস্টার মত সবুজ সাগর।আবার পরের বাক্যে তিনি সাগরকে বলছেন “The scrotumtightening sea.” । অন্য অর্থে সাগরের মূত্রথলি যেন চেপে আছে মূত্র ত্যাগ করার জন্য। সাগর যেন অস্থির অন্তর্গতভাবে। এমন ডুয়েল ইমেজ আমাদের চোখের পর্দায় হাজির করলেন। এমন এ্যবসার্ড ইমেজ দিয়ে সাগরকে আর কেউ কি বর্ণনা করেছেন? মনে হয় না। এই এ্যাবসার্ড ইমেজ দিয়ে জয়েস সাগরকে প্রাণের উৎস হিসাবে পাঠকদের দেখতে বাধ্য করেন। তিনি পরক্ষণেই আবার বলেন – “She is our great sweet mother. Come and look.” সাগরকে মা বলছেন এই ভেবে যে, সাগর থেকেই যেন প্রাণের উৎপত্তি আবার সাগরেই শেষ।

হেমিংওয়ে, অথবা মেলভিলের সাগরের সাথে জয়েসের সাগরের অনেক পার্থক্য। তাঁদের সাগরে মানুষ সাগরের উত্তালতার সাথে যুদ্ধ করে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, আর জয়েসের সাগর যেন প্রাণদায়িনী। জয়েসের সাগর যেন মানুষের মনের কথা শোনার এক নীরব সাক্ষী [এপিসোড-৩]।

(ক্রমশ)

পর্ব-৩ এর লিঙ্ক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s