ইমরান মাঝি’র ‘রূপজালিয়া’ থেকে কয়েকটি কবিতা

130298066_10218117517716030_9062043263371143140_o

“To talk about the other me/ is not done quite so easily/ for i’m not sure which me is me/ and who’s the me that you can’t see.” -Ben lawrie

আমার মনে হয় ইমরান মাঝি একই সঙ্গে দুইটি ভিন্ন জীবনে বসবাস করেন। এর একটি বাহ্যিক জীবন, যেটি সম্পর্কে আমি খুব একটা জানি না। আরেকটি জীবন, কবিতার ভেতরের। ব্যক্তি ইমরান মাঝির সাথে আমার পরিচয় নেই। তবে, কবিতার ভেতরের ইমরান মাঝিকে আমার পরিচিত মনে হয়, আপনও। তার কবিতায় এক ধরনের সারল্য আছে, কপটতাকে দূরে ঠেলে সত্য তার কবিতায় সুন্দর হয়ে ধরা দেয়। তার কল্পিত জগতে সে একজন সত্যিকারের মাঝিই, নদীর ধারে যার বসবাস। তিনি কখনও কখনও নিজেকে বোতলবন্দি করেন ঝরনাজল হয়ে, কখনও কখনও তার জীবন ইদুরকলের মতন কবিতার ভিতরে আটকা পড়ে। বাস্তব আর কল্পনার একটা লুকোচুরি, একটি নামের মাহাত্ম্য, বারবার ফুটে উঠতে চায় তার কবিতায়।

ইমরান মাঝিকে কেনো আপন মনে হয়? সম্ভবত তিনি আমাদের ভুলে যাওয়া, অনেককাল আগে ছেড়ে আসা এক জনপদের গল্প বলেন, আর সে-কারণে আমাদের অবচেতনে দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে। মানুষ, নদী, প্রকৃতি–এই তিনটি উপাদান তার কবিতার প্রধান তিনটি স্তম্ভ। তার কবিতা সুরেলা। স্বরবৃত্তের প্রতি মাঝির একটা ঝোঁকও টের পাওয়া যায়। আবার ‘এই দেশে কৃষকেরা হাওয়া খেয়ে বাঁচে’ বা ‘দিন শেষে রাত আসে হয়ে ইতস্তত’ এই ধরনের বাক্যগুলো দিয়ে আঘাত করেন পাঠকের মনে। প্রথম বই প্রকাশের পর দীর্ঘ বিরতিতে প্রকাশিত হলো ইমরান মাঝির দ্বিতীয় কবিতার বই রূপজালিয়া। শূন্য দশকে যারা ভালো কবিতা লিখছেন, ইমরান মাঝি তাদের মধ্যে অন্যতম। গ্রামবাংলার যে ছবি, জেলে-মাঝিদের যে গল্প, নদীর যে রূপ ইমরান মাঝির কবিতায় পাওয়া গেল, বাংলার বুকে একদিন এসব কিছুই হয়তো থাকবে না। তাদের খুঁজতে আমরা সম্ভবত তখন ইমরান মাঝির এই কবিতাগুলির কাছে ফিরে যাব। – কুশল ইশতিয়াক

বন্দনা
  
 পুবেতে বন্দনা করি সূর্য ওঠে লাল
 তারপরে বন্দনা করি শীতের সকাল।
  
 চারিদিকে ধোঁয়া ধোঁয়া ফোঁটা ফোঁটা জল
 ভালো এই নাড়াকুটা ভালো যে সকল।
  
 তারপরে বন্দনা করি কন্যা তোমার চুল
 তারপরে বন্দনা করি গাছে গাছে ফুল।
  
 তারপরে বন্দনা করি গাছে রসের হাঁড়ি।
 লতাপাতায় ঘেরা থাকে কৃষকের বাড়ি।
  
 তারপরে বন্দনা করি ওরে আমার মন
 তারপরে বন্দনা করি কালো সুন্দরবন।
  
 এইখানে বন্দনা কথা করে দিলাম ইতি
 যেই কন্যার কথা কইব ভরসা জ্ঞান স্মৃতি।
  
  

 আবেদনপত্র
  
 আমায় একটি বাড়ি দে রে বাড়ির মধ্যে থাকি। সঙ্গে আমার বউকে দে রে গাছে হলুদ পাখি দে রে পুকুরে দে মাছ।   বাড়ির আশে-পাশে দে রে বাংলাকলা গাছ।
 পাশে একটু জমি দে রে সিমের চাষ করি। কাব্য লেখার শক্তি দে রে মাঝে মাঝে পড়ি। নিজেই নিজের লেখা পড়ে হো-হো করে হাসি। আমি তো এই বাংলাদেশের গ্রামকে ভালোবাসি।
 আমায় একটি পুত্র দে রে। জীবন চেনার সূত্র দে রে। বাইরে অসীম আকাশ দে রে কেবলা হয়ে তাকিয়ে থাকি। সঙ্গে আমার বউকে দে রে গাছে হলুদপাখি।
  
  
 শালিকের পিতা
  
সন্ধ্যাবেলা ঘরে ঘাসফড়িংগুলো বড়ো বিরক্ত করে আমাকে। সঙ্গে আবার কতগুলো চেনা পোকাও নিয়ে আসে। দাদা যেমন নিয়ে যেত আমাকে কোনো দাওয়াতির বাড়ি।
আমি শালিকের বাচ্চার জন্য ধানের ছড়া থেকে ঘাসফড়িং ধরতাম। মায়ের গায়ে মাথায় দেয়া সরিষার তেল ফেলে দিয়ে যে বোতলে তাদের ভরতাম তা আমার পেট আর হাত-পাগুলো তখন পাখির ঠোঁট হয়ে যেত। বড়োফড়িং পেলে তাকেও আমি শিকারি করার জন্যে কতদিন নিয়ে এসেছি বাড়ি।
পা দিয়ে নেড়ে মাটিতে থাপড় দিয়ে ঘাসফড়িং ধরতে হয়। দুই পা ধরলে তারা মাথা নেড়ে কী যেন বলতে চায়। আর লাফ ও ওড়া দুটোর অধিকারী বলে তাদের ঈর্ষা করেছি বহুবার।
আমি শালিকের মুখ ফাঁক করে জোর করে ফড়িং দিতাম। যেমন কোনো মা বাচ্চাকে শেখায় চাল-ডাল খাওয়া। তখন ধরতে বড়ো কষ্ট হতো। এখন কতগুলো পড়ছে এসে ঘরে। কিন্তু খাঁচা আর শালিক তাই গেছে হারিয়ে।
  
  
 এই বাংলায় সবাই মাঝি
  
 এই বাংলায় সবাই মাঝি, সবাই মাঝির বেটা। বাংলাদেশে মাঝি বিনে অন্য আছে কেটা।
 চারিদিকে জল। নদী যেন ভালো রাজা শক্তি সাহস বল, দিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। নদীর কাছে ঋণ, কার নেই বাংলায়। বাউল যে গান গায় কই পেল সুর। নদীই তো শিখিয়েছে জীবনের ভাঙচুর। ভেঙে ভেঙে গড়া। ঢেউ যেন ঢেউ নয় বাস্তবপরা।
 এই ভূমি বড়ো কোনো ভেসে থাকা মাছ। চারিদিকে জল যেন কোনো জাদুকাচ। উপমায় মাঝি আসে জলে ভেসে ভেসে। বর্ষায় সকলেই মাঝি এই দেশে।
  
  
 সাগরের জল যেন কোনো জাদুকাচ
  
সমুদ্রের কূলে। হাইট্টামাছ আটকে থাকে নিজেদের ভুলে। ছোটো ছোটো মাছ। সাগরের জল যেন কোনো জাদুকাচ।
মনে হয় তারা। বড়ো মাছ ভয় পেয়ে হয়ে দিশাহারা। কূলে চলে আসে। জলের ওপরে ভাসে। যেন সব মুড়ি। আমি ঢিল ছুড়ি। পুরোপুরি ডুবে যায়। কাকগুলো ধরে খায়। এমন রুপালি মাছ। সাগরের জল যেন কোনো জাদুকাচ।
বন থেকে কাঠ। সংগ্রহ করি আমি ঘর বালু মাঠ। ঝাঁকিজাল দিয়ে। হাইট্টামাছ ধরে খাই পুড়িয়ে পুড়িয়ে। তারপর নাচ। সাগরের জল যেন কোনো জাদুকাচ।
  
 জীবন কি এই ঘরের ভেতর শিশির ধরে রাখা
  
টাপুরটুপুর শিশির পড়ে। শিশির পড়ার শব্দে ঘরে...যাচ্ছে না তো থাকা। জীবন কি এই ঘরের ভেতর শিশির ধরে রাখা। জীবন কি এই খেলনা নাকি বিলের মধ্যে ধোঁয়া। দৃশ্য ছোঁয়া। শিশির যেন চাদর। ঘরের মধ্যে সোনা রুপার জল ছিটিয়ে দিচ্ছে জামাই আদর।
জীবন কি এই শিশির দেখা বসে বসে মাঠে। আমি যেন অর্জুন গাছ শানবাঁধানো ঘাটে। জীবন কি এই ঘাটের বধূ চাল ধুয়ে যায় বাড়ি। পুকুর পাড়ে ভাঙা চাড়ি। চাড়ির ভেতর জল। জীবন কি এই ঘরের ভেতর ইঁদুর মারা কল।
আমি তো এই মাঠকে চিনি, চিনি পাশের ঘর। বিশাল মাঠে বাড়ি যেন নদীর মাঝে চর। চরে বসে ঘরে বসে শিশির পতন শুনি। পতনরত শব্দ গুনি। এই কি আমার জীবন। শিশির ভেজা ঘরের মধ্যে আটকে গেছে মন।
  

  
  
   
রূপজালিয়া। ইমরান মাঝি । প্রকাশক: বৈভব। প্রকাশকাল: জানুয়ারি, ২০২১ ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s