কবিতারোহণ :: অমিতাভ পাল

Jibanananda-Das

চারদিকে এখন ছোট কবিতার স্ফূরণ। দৃঢ়বদ্ধ, বিড়ালের চোয়ালের মতো ছোট, চৌকো কবিতা এখন বাংলা কবিতার প্রদর্শকের ভূমিকা নিয়েছে। অথচ এটা কোন আকস্মিক ভূমিকা না। একটা ক্রমবিবর্তনেরই ফল হিসাবে সে যোগ্যতম। একটা নিভৃত অগ্রগতি। পৃথিবীর পর্বতারোহণের ইতিহাসে চূড়ার সবচেয়ে কাছের বাহুল্যহীন বিজয়ীর মতো যেন। আর দুর্গমতাই এই সংক্ষিপ্ততাকে অনুমোদন করে। জীবনের জটিল দুর্গমতা। এবং প্রাচীনকাল ছিল প্রস্তুতির সময়। পাহাড়ের পাদদেশে ছড়ানো মালপত্র আর তাঁবুর সমারোহ —মহাকাব্যের জনবসতি। তারপর কবিতারোহণ শুরু হয়েছে —বিভিন্ন উচ্চতায় বসেছে পথিপার্শ্বের তাঁবু। কেউ কেউ সেই তাঁবুর উঠানে রচনা করেছে নিজস্ব বাগান অথচ অগ্রবর্তিতা তখনো চলিষ্ণু। উচ্চতার পর উচ্চতা অতিক্রম করে অবশেষে বৃহত্তর একটি চাতালে—অথবা যেন চূড়া সংলগ্নও —দীর্ঘদিন ধরে থেমে আছে বাংলা কবিতা। এই চাতালটি জীবনানন্দের। এখানেই এখন জ্বলছে অগ্নিকুণ্ডের তোড়া —চারপাশে জমেছে সখ্যতার ভিড় এবং সেই ভিড় ক্রমশ উচ্চকিত, স্পষ্ট হয়ে চাতালের নিরবতাকে অনেক অনেক শব্দের জননী করে তুলছে। অবশ্য একজন আরো একটু কৌতুহলী হয়ে উঠেছেন। অগ্নিকুণ্ডের উষ্ণতা ছেড়ে টর্চলাইট নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন খুঁজে বের করতে আরোহণের রাস্তা। একা এই অভিযাত্রী বিনয় মজুমদার। হয়তো তিনিও একদিন নিজের চাতাল খুঁজে পাবেন —হয়তো পেয়েছেনও।



বাংলা কবিতা এই দূরত্ব অতিক্রমের পথেই বিসর্জন দিচ্ছে তার বাহুল্য। আর এই বিসর্জনের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত যার কবিতায় পাওয়া যায় —সেই জীবনানন্দও ছোট কবিতার দিকে ঝুঁকেছিলেন সর্বোপরি। আর স্ববিবর্তনের সুমহান নায়ক এই কবির এই পক্ষপাতিত্ব ছোট কবিতার পক্ষাবলম্বনকারীকে আরেকটু নির্লজ্জ করে যেন।

আমরা যখন ক্ষুদ্রতমের দিকে যাই —মৌলিকত্বের দিকেই হয়তো —বৃহত্তর পুরানো হয়ে পড়ে। মেরুদন্ডী প্রাণীর শ্রেণী বিভাজিত হয় আমিষাশী ও নিরামিষাশীতে। এবং এই দুই শ্রেণীও পুরানো বৃহত্তর হয়ে গেছে। আরো বিশিষ্ট, আরো মৌলিক শ্রেণীতে এখন পৃথিবী ভরপুর। যেন একটা বহুতল জীবন অনেক খন্ড খন্ড জীবনের ফ্ল্যাটের যোগফল। একটা ফ্ল্যাটের জীবনী তাই বিশিষ্ট, একক। একটা প্রবহমান জীবনে ছলকে ওঠা একটা অতিরিক্ত ঢেউ। একটা সমগ্র জীবনের শক্তিতে লাফানো।

কবিতা একেই অনুসরণ করে। জীবনের এই উৎসারণকে। ফলে, একটি মূহূর্ত কবিতার বিষয়। একটি সুদীর্ঘ মূহূর্ত যা মহাসময়কে ধারণ করে আছে।

সৃষ্টির মূহূর্ত থেকেই কবিতা ছোট হয়ে আসছে। এটি যেমন আবহমান সময়ের জন্য সত্য, তেমনি ব্যক্তি কবির জীবনেও। একটা বিরাট পৃথিবী থেকে ছেঁকে নিয়ে নিজের জগত—কবি তার কবিতাকে সংঘবদ্ধ করেন, শীর্ণ করেন। সেই কবিতার একেকটা শব্দে সেই শব্দের জগত উন্মোচিত হয়—শব্দ হয়ে ওঠে প্রাণবান। আর এইসব শব্দ মিলে একটি কবিতাকে সমগ্র প্রাণে পরিণত করে। আর মূহূর্ত যেহেতু কবিতার প্রাণ—তা ইঙ্গিতের। এবং ইঙ্গিতে অনেক শব্দ যেন নেই। যেন তা একটা সুঁইয়ের প্রবেশের সময়ের মতো। একটা তীক্ষ্ণ বোধ কেবল—সমস্ত ত্বকের ভাষা তাতে রোমাঞ্চিত, বিস্মিতও হয়তো। অর্থাৎ সব অর্থেই কবিতা এখন সংক্ষিপ্ত। যেন স্পষ্ট অন্তর্বাস। অথবা শুধু কবিতাই বা কেন—পৃথিবী নিজেই এখন একটা বিমানবন্দরের মতো সীমিত, একক।

মানবজাতি এখন একজন মানুষের মধ্যে থাকে।

লেখক-পরিচিতি:

104483790_10157699662434983_3011008031757481922_n

।অমিতাভ পাল। কবি, গল্পকার, গদ্যকার। জন্ম ১৯৬২। কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা: মিডিয়াকর্মী।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s