জেমস জয়েস’র ইউলিসিস (পর্ব-৫) :: পায়েল মণ্ডল

এপিসোড-২ (নেস্টর)

ইউলিসিসের দ্বিতীয় অধ্যায়কে নেস্টর নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জয়েস অডিসির বিষয়বস্তু তাঁর এই উপন্যাসে সমান্তরাল ভাবে ব্যবহার করেছেন। অডিসির দ্বিতীয় কাণ্ডে দেখা যায় যে, টেলিমেকাস তার বাবার বন্ধু নেস্টরের কাছে যান বাবার খোঁজে কিন্তু নেস্টর তাকে ইউলিসিসের কোনো খবর দিতে পারে না।

জয়েসের উপন্যাসে এই অধ্যায়ে অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র স্টেফানকে দেখা যায় একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষাদান করছে। এক পর্যায়ে স্টেফান ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিস্টার ডিজির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মত বিনিময় করে। কিন্তু, তিনি স্টেফানের প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেন না যাতে স্টেফান একমত হতে পারে। ঠিক যেমন নেস্টর টেলিমেকাসকে নির্দিষ্ট করে বলতে পারেনি তার বাবাকে কোথায় কেমন ভাবে পাওয়া যেতে পারে।

জয়েস এই এপিসোডে ডিজি এবং স্টেফানের কথোপকথনের মাঝে তুলে ধরেন যে আইরিশরাও যেন ইহুদিদের মত দেশহীন জাতি। তাদের মাতৃভূমি যেন অন্যরা দখল করে রেখেছে। আমরা আঁচ করতে পারি আইরিশদের ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব। তাদের অস্তিত্ব সংকটের আভাস। এই অধ্যায়ে জয়েসর ফোকাস যেন ইতিহাসের দিকে, ঠিক টেলিমেকাসের নেস্টরের কাছ থেকে উত্তর না পাওয়া। ইতিহাস স্টেফান ডেডেলাসের মনে ঘুরপাক খাওয়া কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না।

প্রথম এপিসোডের বর্ণিত ঘটনার সম্ভবত ঘন্টাখানেক পরে নেস্টর এপিসোডের শুরু ছেলেদের বিদ্যালয়ে। স্টেফান ইতিহাসের ক্লাস নিতে গিয়ে তুলে ধরে কেমন ভাবে রোমানরা গ্রীকদের এক সময় শাসন করতো, ঠিক তেমন ভাবে এখন ব্রিটিশরা আইরিশদের শাসন করছে। ক্লাসরুমের এই আলোচনার আলোকে জয়েসকে জাতীয়তাবাদী বলা যাবে না, বরং তিনি ডাবলিনকে এক আন্তর্জাতিক শহর হিসাবে চিত্রিত করেছেন।

স্টেফান ডেডেলাস ইতিহাসে আচ্ছন্ন হয়ে আছে, এবং সে চায় তার ছাত্ররা ইতিহাস সম্পর্কে তার মতামত শুনুক। কিন্তু, হকি খেলার সময় হয়ে যাওয়ায় তারা খেলতে চলে যায়। স্টেফান ডেডেলাস তার মতামত পুরোপুরি ভাবে জানাতে পারে না।

এর পরের দৃশ্য স্টেফান ও মিস্টার ডেইজির কথোপকথনের। তাদের কথার বিষয়বস্তুও ইতিহাস। স্টেফান মনে করে ইতিহাসের সাথে স্মৃতির যোগসূত্র থাকা উচিত নয়, অথচ মিস্টার ডেইজি মনে করেন ইতিহাস হলো মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের ভাণ্ডার এবং তা ব্যক্তিগত স্মৃতির আলোকে পুনর্গঠন এবং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু, স্টেফানের কাছে ইতিহাস হলো এমন ঘটনা প্রবাহ, যা কখনই নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। এবং তাই সে উচ্চারণ করে সেই বিখ্যাত উক্তি- History is a nightmare from which I am trying to awake!

ইতিহাস স্টেফানের কাছে বিভীষিকাময় অধ্যায়। বিশেষ করে তার ব্যক্তিগত জীবনের ইতিহাস। প্রথম এপিসোডে আমরা দেখতে পাই তার মায়ের মৃত্যূদৃশ্য, যেখানে সে তার মায়ের মৃত্যুর মুহূর্তে শেষ প্রার্থনা করতে অস্বীকার করে। আলবেয়ার কামুর দি স্ট্রেঞ্জার এর নায়ক মার্সোর সাথে স্টেফানের একটা ক্ষীণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তবে মার্সো কখনই স্টেফানের অল্টার ইগো নয়।  মার্সোকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করার পরে ঈশ্বরের কাছে শেষ ক্ষমাপ্রার্থনা করেনি, হয়তো সে মনে করেছিল যে, তার দ্বারা ঘটিত হত্যাকাণ্ডটি ছিল তার আত্মরক্ষার জন্য, তাই এখানে অনুতপ্ত হবার কোনো সুযোগ নেই। স্টেফানের কাছে মনে হয়েছে যে, মানুষের জীবন সময় প্রবাহিত হয় একটা নিয়তি নির্ধারিত অনন্ত সময়ের বাস্তবতায় বসবাসের জন্য। তার মা সেই সময়ের পথ বেয়ে অসীম সময়ের বাস্তবতায় যাত্রা করছেন, সেখানে একজন আধুনিক বোহেমিয়ান মানুষ কেনো আত্মার মুক্তির জন্য প্রার্থনা করবে? ওই প্রার্থনা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়। ইতিহাস স্টেফানের কাছে বিভীষিকাময় অধ্যায়। বিশেষ করে তার ব্যক্তিগত জীবনের ইতিহাস।

জয়েস যেন সিনেমাস্কোপের মত একের পর এক খণ্ডচিত্রকে ফোকাস করেন আর তাদের জুড়ে দেন অর্থবহ বাক্যে, প্যারা, এবং এপিসোডে তার ইউনিক শব্দের জাদুকরী ব্যবহারে। তিনি যেন একজন মাস্টার ইমেজিস্ট, যে অনায়াসে লিখে চলেছে মডার্ন এপিক। স্ট্রিম অফ কনশাসনেসের জাদুসূত্রে শব্দ, বাক্যে, প্যারা একত্রিত করে গঠন করেন এক একটি এপিসোড বা মহাকাব্যের সর্গ।  স্ট্রিম অফ কনশাসনেসকে যেন টরে টক্কার ছন্দের মত ব্যবহার করেন একটি বিশেষ ঐক্যে। তার চরিত্র যেন মুহূর্তের মাঝে বাস্তবতা থেকে হারিয়ে যায় চিন্তার প্রবাহমানতায়, আবার ফিরে আসে বাস্তবতায়। আর তাই আমরা দেখি মিস্টার ডিজির সাথে কথোপকথনের সময় ছাত্রদের হকি খেলার গোলমাল, উল্লাস, চেঁচামেচি স্টেফানে কানে ধ্বনিত হয় যেন একটা রক্তাক্ত যুদ্ধের মত। আর ইশ্বর যেন তার কাছে রাস্তার মানুষদের ‘সম্মিলিত চিৎকার’ ছাড়া আর কিছু নয়।

জয়েস যেন এক এবং অদ্বিতীয় ইমেজিস্ট।  তাঁর কলমে প্রতিটি শব্দ ছন্দময় হয়ে ওঠে সিম্ফনির মুভমেন্টে। এই এপিসোড শেষ করেন এক অনবদ্য কাব্যিক বাক্যে- On his wise shoulder, through the checkerwork of leaves the sun flung spangles, dancing coins!

(ক্রমশ)

পর্ব-৪ এর লিঙ্ক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s