মার্জিনাল নোটস অন দা বুক অফ ডিফিট : নিজার কাব্বানি :: তর্জমাঃ ইরফানুর রহমান রাফিন

maxresdefault

অনুবাদকের নোটঃ ১৯৪৮’র ১৪ মে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের বুকে এই জায়নবাদী সেটেলার-উপনিবেশিক রাষ্ট্রের পত্তনে তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। যেটা অনেকেই জানেন না, সেটা হল, প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দুই দশক ইজরায়েল পশ্চিমা বিশ্বের সামান্যই সহায়তা পেয়েছিল। কারণ মূলত দুটি। এক, ইজরায়েলকে আইনী স্বীকৃতি দেয়া প্রথম রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন হওয়ায় (১৭ মে ১৯৪৮), নবগঠিত রাষ্ট্রটি তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক ব্লকের অংশ হয়ে উঠবে পশ্চিমের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর এমন আশঙ্কা  ছিল। দুই, বিশ্বযুদ্ধোত্তর দুনিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানো, যে-কাজে পশ্চিম জার্মানিকে পাশে পাওয়া প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। এসব কারণে আরব-ইজরায়েল সংঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো একটা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ জাতীয় ভারসাম্য রক্ষার নীতি অনুসরণ করে।

এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে ১৯৬৭’র জুনে। প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্র সিরিয়া, মিশর, আর জর্দানের সাথে ইজরায়েল একটা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ছয় দিনের মাথায় দুই পক্ষের মধ্যে যখন যুদ্ধবিরতি চুক্তি সাক্ষরিত হল, ততক্ষণে গাজা উপত্যকা, জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, সিনাই উপদ্বীপ, আর গোলান মালভূমি ইজরায়েলের দখলে চলে গেছে। যুদ্ধের এই ফলাফল পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর ভেতরে, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে, ইজরায়েলের প্রতি ব্যাপক সমীহ তৈরি করে। নরম্যান ফিঙ্কেলস্টেইনের ভাষায়, “Impressed by Israel’s overwhelming display of force, the United States moved to incorporate it as a strategic asset. […] Military and economic assistance began to pour in as Israel turned into a proxy for US power in the Middle East.” এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্যই নয়, সার্বিকভাবে আরবদের জন্য, সুদূরপ্রসারী ও ক্ষতিকর বলে ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে।

১৯৬৭’র জুন যুদ্ধ নিজার কাব্বানির কবিতায়ও পরিবর্তন আনে, তিনি ‘প্রেমের কবিতা লেখা লোক’ থেকে ‘ছুরি হাতে কবিতা লেখা লোকে’ রূপান্তরিত হন। এই কবিতাটি তিনি ছুরি হাতে নিয়ে লিখেছেন। এই ছুরি চালানো হয়েছে আরব স্বৈরতন্ত্রীদের বুকে, নিজার যাঁদেরকে রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্বদানের অনুপযোগী বিবেচনা করতেন, আর কবিতাটি শেষ হয়েছে সেই আরব ছেলেমেয়েদের আগমনের আকাঙ্ক্ষায় যারা ‘পরাজয়কে অতিক্রম করবে’।

১.
 বন্ধুরা,
 পুরনো শব্দ মরে গেছে।
 মরে গেছে পুরনো বইগুলো।
 মরে গেছে জীর্ণ জুতার মত ছিদ্রযুক্ত আমাদের ভাষণগুলোও।
 মরে গেছে সেই মন, যা আমাদের পরাজয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
  
 ২.
 আমাদের কবিতাগুলো চুকা হয়ে গেছে।
 চুকা হয়ে গেছে মেয়েমানুষের কেশ, রাত্রি, পর্দা আর সোফা।
 সবকিছু চুকা হয়ে গেছে।
  
 ৩.
 আমার শোকার্ত দেশ, চকিতেই
 তুমি পাল্টে দিয়েছ আমায়, সেই প্রেমের কবিতা লেখা লোকটি
 এখন ছুরি হাতে নিয়ে কবিতা লেখে।
  
 ৪.
 যা আমরা অনুভব করছি তা বর্ণনাতীতঃ
 আমাদের কবিতাগুলোর জন্য আমাদের লজ্জা হওয়া উচিত।
  
 ৫.
 আলোড়িত হয়ে পূর্বদেশীয় বাগাড়ম্বরে,
 সেই অহমিকায়, যা কখনো একটা মাছিও মারে নি,
 বেহালা আর ঢাক বাজাতে বাজাতে,
 আমরা যুদ্ধে গিয়েছি
 আর হেরে গেছি।
  
 ৬.
 আমাদের পদক্ষেপের চেয়ে আমাদের চিৎকারের শব্দ বেশি,
 আমাদের তরবারিগুলো আমাদের চেয়ে লম্বা,
 এই হল আমাদের ট্র্যাজেডি।
  
 ৭.
 সংক্ষেপে বললে
 আমরা সভ্যতার জামা পরে থাকি
 কিন্তু আমাদের আত্মাগুলো প্রস্তর যুগে বাস করে।
  
 ৮.
 বেণু আর বাঁশি বাজিয়ে
 তুমি একটা যুদ্ধে জিততে পারবে না।
  
 ৯.
 আমাদের অস্থিরতার
 মূল্য দিচ্ছে পঞ্চাশ হাজার নতুন তাঁবু।
  
 ১০.
 খোদাকে দোষ দিও না
 যদি তিনি তোমাকে ছেড়ে যান,
 পরিস্থিতির দোহাই দিও না।
 খোদা যাকে খুশী তাকে জয়যুক্ত করেন।
 তিনি তো আর কামার নন যে তরবারি পেটাবেন।
  
 ১১.
 সকালের সংবাদ শুনতে কী যে খারাপ লাগে!
 কী যে খারাপ লাগে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনতে!
  
 ১২.
 আমাদের শত্রুরা সীমান্ত পেরোয় নি
 পিঁপড়ের মত এগিয়েছে আমাদের দুর্বলতার ভেতর দিয়ে।
  
 ১৩.
 পাঁচ হাজার বছর ধরে
 গুহায় থেকে থেকে
 দাঁড়ি গজিয়েছে আমাদের।
 অজ্ঞাত আমাদের মুদ্রা,
 আমাদের চোখগুলো মাছিদের স্বর্গ।
 বন্ধুরা,
 দরজাগুলো ভেঙে ফেল
 তোমাদের মাথাগুলো জঞ্জালমুক্ত কর,
 তোমাদের জামাকাপড় ময়লামুক্ত কর।
 বন্ধুরা,
 একটা বই পড়,
 একটা বই লেখ,
 শব্দ, ডালিম, আর আঙুরের চাষাবাদ কর,
 সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যাও কুয়াশা ও তুষারের দেশে।
 কেউ জানে না তোমাদের গুহাবাসী জীবনের কথা।
 লোকেরা ধরে নিয়েছে তোমরা একটা খচ্চরের জাত। 
  
 ১৪.
 আমরা মোটা-চামড়ার লোক
 যাদের আত্মাগুলো শূন্য হয়ে গেছে।
 আমরা জাদুবিদ্যা চর্চা করে, দাবা খেলে, আর ঘুমিয়ে
 দিন কাটাই।
 আর আমরাই কিনা ‘মানবজাতির জন্য আল্লাহর রহমত’?
  
 ১৫.
 আমাদের মরুভূমির তেলসম্পদ হয়ে উঠতে পারত
 আগুন আর অগ্নিশিখার খঞ্জর।
 আমরা আমাদের মহান পিতৃপুরুষের জন্য কলঙ্ক বয়ে এনেছিঃ
 বেশ্যার পায়ের আঙুলগুলোর ভেতর দিয়ে আমাদের তেলসম্পদ বয়ে যেতে দিয়েছি।
  
 ১৬.
 মানুষজনকে দড়িতে বেঁধে টানতে টানতে
 আমরা বন্যের মত দৌড়াই এক সড়ক থেকে আরেক সড়কে,
 জানলা আর তালাগুলো দুমড়েমুচড়ে দিয়ে।
 আমরা ব্যাঙের মত তারিফ করি,
 কসম খাই ব্যাঙের মত,
 বামনদেরকে নায়ক বানিয়ে ফেলি,
 আর নায়কদেরকে আবর্জনাঃ
 আমরা কখনো থামি না, চিন্তা করি না।
 আমরা মসজিদগুলোয়
 অলসভাবে সিজদা দেই,
 কবিতা লিখি,
 রচনা করি প্রবচন,
 আর খোদার কাছে ভিক্ষা চাই
 তিনি যেন আমাদেরকে শত্রুদের ওপর জয়যুক্ত করেন।
  
 ১৭.
 যদি আমার কোনো ক্ষতি করা হবে না এ-নিশ্চয়তা পেতাম,
 আর যদি দেখতে পেতাম সুলতানকে,
 আমি তাঁকে বলতামঃ
 'সুলতান,
 আপনার পাগলা কুকুরগুলো ছিঁড়ে ফেলেছে আমার জামা
 আপনার গোয়েন্দারা তাড়া করে ফিরছে আমাকে
 তাদের চোখগুলো আমাকে তাড়া করে ফিরছে 
 তাদের নাকগুলো আমাকে তাড়া করে ফিরছে 
 তাদের পাগুলো আমাকে তাড়া করে ফিরছে 
 তারা আমাকে নিয়তির মত তাড়া করে ফিরছে
 আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে 
 আর লিখে নিচ্ছে আমার বন্ধুদের নাম,
 সুলতান,
 যখন আমি আপনার দেয়ালের কাছে এসেছিলাম,
 আর বলেছিলাম আমার ব্যথার কথা,
 আপনার সৈনিকরা আমাকে বুট দিয়ে লাথি মেরেছিল,
 আমাকে বাধ্য করেছিল আমার জুতাগুলো খেয়ে ফেলতে।
 সুলতান,
 আপনি দুই দুটো যুদ্ধে হেরে গেছেন।
 সুলতান,
 আমার দেশের অর্ধেক মানুষ ভাষা হারিয়ে ফেলেছে,
 ভাষা হারিয়ে ফেলা মানুষ দিয়ে কী হয়?
 আমার দেশের অর্ধেক মানুষ
 পিঁপড়া আর ইঁদুরের মত ফাঁদে পড়েছে
 দেয়ালগুলোর ভেতরে।'
 যদি আমার কোনো ক্ষতি করা হবে না এ-নিশ্চয়তা পেতাম,
 আমি তাঁকে বলতামঃ
 'আপনি দুই দুটো যুদ্ধে হেরে গেছেন
 শিশুদের সংস্পর্শ আপনি হারিয়ে ফেলেছেন ।'
  
 ১৮.
 আমরা যদি আমাদের ঐক্যকে কবর না দিতাম
 আমরা যদি তার কচি দেহটাকে বেয়নেট দিয়ে ফেড়ে না ফেলতাম
 যদি সে আমাদের দুচোখ জুড়ে থাকত
 কুকুরেরা এভাবে আমাদের মাংস ছিঁড়ে খেত না।
  
 ১৯.
 আমরা একটা রাগী প্রজন্ম চাই
 যারা আসমানে লাঙল চালাবে
 যারা ইতিহাসকে উড়িয়ে দেবে
 যারা আমাদের চিন্তাগুলোকে উড়িয়ে দেবে।
 আমরা একটা নতুন প্রজন্ম চাই
 যারা কোনো ভুল ক্ষমা করে না
 যারা নত হয় না।
 আমরা চাই একটা দৈত্যদের প্রজন্ম...
  
  
 ২০.
 আরব ছেলেমেয়েরা,
 ভবিষ্যতের শস্যবীজেরা,
 তোমরা আমাদের শেকলগুলো ভেঙে ফেলবে।
 ধ্বংস করবে আমাদের মগজের আফিম,
 সব বিভ্রমের অবসান ঘটাবে।
 আরব ছেলেমেয়েরা,
 আমাদের বাতায়নহীন প্রজন্ম নিয়ে পড়াশোনা কোরো না।
 আমরা একটা জলে যাওয়া প্রজন্ম।
 তরমুজের খোসার মতই মূল্যহীন।
 আমাদের নিয়ে পড়াশোনা কোরো না,
 আমাদেরকে নকল কোরো না,
 আমাদেরকে গ্রহণ কোরো না,
 আমাদের ধ্যানধারণা গ্রহণ কোরো না,
 আমরা একটা জোচ্চোর আর জাদুকরদের জাতি।
 আরব শিশুরা,
 বসন্তের বৃষ্টি,
 ভবিষ্যতের শস্যবীজ,
 তোমরা সেই প্রজন্ম
 যারা পরাজয়কে অতিক্রম করবে। 

12961430_1059739930756613_240847588780733470_o

অনুবাদক-পরিচিতি: ইরফানুর রহমান রাফিন। কবি,গদ্যকার, অনুবাদক।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s