জেমস জয়েস’র ইউলিসিস (পর্ব-৬) :: পায়েল মণ্ডল

এপিসোড—৩ (প্রটিয়াস): ইউলিসিস উপন্যাসের তৃতীয় এপিসোড’কে ইউলিসিস বোদ্ধারা প্রটিয়াস নামে আখ্যায়িত করেছেন, যদিও জয়েস তাঁর এই উপন্যাসটির অধ্যায়গুলোকে কোনো ক্রম-সংখ্যায় সাজাননি। গ্রীক মিথে প্রটিয়াস হলো সাগর-দেবতা, যে তার আকার সদা পরিবর্তন করতে পারেন, পারেন ভবিষ্যত বলে দিতে। তার ইচ্ছায় সাগরের রূপের পরিবর্তন হয়। প্রটিয়াস শুধু তারই ভবিষ্যৎবাণী করবেন যে তাকে বশে আনতে পারবে। প্রটিয়াস গ্রীক মিথলজিতে সার্বজনীনতার প্রতীক।


ইউলিসিসের তৃতীয় এপিসোড  প্রটিয়াস নামে আখ্যায়িত করার পেছনে এই কারণ থাকতে পারে যে, এই এপিসোডে জয়েস উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র স্টেফান ডেডেলাসের মাধ্যমে পুরো এপিসোড জুড়ে সম্ভবত বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম মনোমুগ্ধকর মনোলগ উপহার দেন। হেনরি বার্গসন’র স্ট্রিম অফ কনশাসনেসকে জয়েস এক চুড়ান্ত উচ্চতায় নিয়ে যান তাঁর অসাধারণ শব্দের মায়াজালে। বার্গসন’র অন্য অনুসারী এজরা পাউন্ড ও ডরথি রিসার্ডসন-ও যেন এখানে জয়েসের উজ্জ্বলতার কাছে ম্লান। জয়েস যদি উপন্যাসটি পুরোপুরি নাও লিখতেন, তবুও হয়তো এই একটি এপিসোডের জন্য বিশ্বসাহিত্য তাঁকে শতবর্ষ মনে রাখতো। জয়েস দেখিয়ে দেন যে, স্ট্রিম অফ কনশাসনেস কেমন ভাবে জাদু-চেতনার মাঝ দিয়ে পাঠকদের মনের গভীরে পৌঁছে দেয়া যায়। এই এপিসোডটি আসলে শুধুমাত্র পাঠ করার জন্য নয়, বরং তা অবশ্য শ্রবণীয়! জয়েস দেখিয়ে দেন শব্দ কেমনভাবে কাব্যময়তার জন্ম দেয় আর সেটা কতখানি ছন্দময় হয়ে মনোজগতের চিন্তা অবাধ্য জলপ্রপাতের মত পাঠকদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। পুরো এপিসোডটি যেন জয়েসের স্মৃতিতে ধরা ছিল- তিনি শুধু কলম ধরেছেন আর সেটা অটো-রাইট হয়ে গিয়েছে, যেমন শ্রী অরবিন্দ লিখেছিলেন তার ইংরেজি মহাকাব্য সাবিত্রী।

সময় আনুমানিক সকাল এগারোটা! স্থান স্যান্ডিমাউন্ট স্ট্রান্ড সৈকত। ডাবলিন। স্টেফান একাকী। জয়েস তাকে বাস্তব ও অবাস্তবের প্রান্তসীমায় চিত্রায়ন করছেন। চিত্রায়ন করছেন তার মনোজগতের দ্বন্দ্ব, তার ভাবনা, তার মনোবিশ্লেষণ এক নতুন ভাষায়, যা আগে কোন লেখক এমন ভাবে লেখার চেষ্টা করেননি। উপন্যাসটির আঠারো এপিসোড বাদ দিলে এই এপিসোডটি নির্মিত হয়েছে এক উচ্চমার্গের ভাষায় যা একান্তই জয়েসের। এপিসোডটি তিনি শুরু করেন এমন শব্দমালায়—Ineluctable modality of the visible : at least that if no more, thought through my eyes. Signatures of all things I am here to read…..! জয়েসের এই বাক্য পাঠকদের এক উদাস শূন্যতায় নিয়ে যায়, যা দৃশ্যমানতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তিনি পাঠকদের উপলব্ধির দরজা খুলে দেন তাঁর লেখাকে অনুভব করার জন্য। জয়েস স্টেফানের ভাবনায় তার সামনে দৃশ্যমান জগতকে এমন ভাবে পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করেন।

স্টেফান চোখ বন্ধ করে আর তার কানে চারপাশের জগতের কলরব ছন্দের ঐকতানে বাজে। স্টেফান চোখ খুলে তাকায়, জয়েস তার চোখে দেখান সমুদ্রের এ্যাবসার্ড সৌন্দর্য। জয়েস সমুদ্রকে বর্ণনা করেন এমন ভাবে—Snortgreen, blue silver, rust..! মাত্র চার শব্দে মাস্টার ইমেজিস্ট জয়েস সমুদ্রের এক অপরূপ দৃশ্যকল্প চিত্রায়ন করেন যা, বাংলা ভাষায় হয়তো এমন ভাবে বলা যেতে পারে—জলন্ত নীল সাগরের জল সবুজ বোস্টার মরিচায় ঢাকা!


স্টেফান দেখে দুজন রমণী সৈকতে হাঁটছে ব্যাগ হাতে। তার কল্পনা সাগর থেকে তাদের দিকে নিবদ্ধ হয়। তার মনে হয় মহিলারা তাদের ব্যাগে ফিটাস বহন করছে। সে কল্পনায় এডেনভিল’র (স্বর্গ) সাথে ঐ ফিটাসের নাড়ির মাধ্যমে যোগাযোগ করে। জয়েস বর্ণনা করেন এমন ভাবে— Hello! Kinch here! Put me onto Edenville: Alpha! Alpha!! Nought, nought, one!  অনবদ্য ছন্দময় শব্দ যার একটি থেকে আর একটি শব্দের মাঝে এক নীরবতার পজ বিদ্যমান, যা দিয়ে জয়েস পাঠকদের বোঝাতে পারেন মর্ত্য আর স্বর্গের মাঝের অনিঃশেষ দূরত্ব! স্টেফান দেখতে পায় ইভের নাভীহীন পেট। যেহেতু ইভ কোনো মানবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেননি তার নাভী থাকার কোন প্রশ্নই নাই। স্টেফানের ভাবনায় ধরা দেয় মানবীর প্রথম পাপের মিথ। মানবীর ওই পাপ মানুষকে পৃথিবীবাসী করেছে।


তার চিন্তা ইভ থেকে সরে আসে খৃষ্টের দিকে। সে মনে করে খৃষ্ট ঈশ্বরের প্রতিরূপ, সে শূন্য থকে সৃষ্ট। সে ঈশ্বরপুত্র নয়। স্টেফান নিজেকে তেমনি ভাবে – যে তার আত্মাও এক শূন্যতা থেকে সৃষ্ট যদিও তার একজন বায়োলজিকাল পিতা আছে। সে মনে করে তার আত্মার আবির্ভাবের জন্য তার বায়োলজিকাল পিতার ভূমিকা নগণ্য। আবার পরক্ষণেই তার মনে হয় পিতা ও পুত্রের অস্তিত্ব কি এক?

স্টেফান হারিয়ে যায় চিন্তার প্রবাহমানতায়, তার পিতৃ-পরিচয়ের খোঁজে! এটা হয়তো তার আইডেন্টিটি ক্রাইসিস। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের হাড্ডি খিজিরও জানে না তার পিতৃ-পরিচয়। তার কথা ভিন্ন। সে তো এক স্বাধীনতাকামী দেশের সংগ্রামী দেবশিশু। দেবেশ রায়ের তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্তের -বাঘা! সেও পিতৃ পরিচয়হীন শূন্যতার পুত্র, যাকে প্রকৃতি তার অপার আদরে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। যে তার নামের পরে একটা বংশের নাম জুড়ে দিতে এলাকার বিধায়কের কাছে আকুল আবেদন করে। অথবা সময় অসময়ের বৃত্তান্তের আর এক শূন্যতার পুত্র কেলু। যে প্রকৃতির গর্ভ থেকে নেমে আসে জনপদে, শহরে। যার বাস শহরের রাজপথ, গলি, তস্য গলিতে। এই মানুষগুলোও তাদের চিন্তার প্রবাহের তটরেখা ধরে নিজেদেরকে পাঠকদের চোখে একটা পূর্ণাঙ্গ অবয়ব আঁকেন। তারা ভিন্ন সময়ের ভিন্ন প্রেক্ষাপটের শূন্যতার পুত্র -যেমন স্টেফান নিজেকে ভাবে তার চেতনা প্রবাহে।


সমুদ্রের নোনা হাওয়ার ঝাপ্টায় স্টেফান ফিরে আসে বাস্তবে। তার মনে পড়ে মিস্টার ডিজীর দেয়া পত্র পত্রিকা অপিসে দিয়ে বাক মুলিগানের সাথে ১২:৩০ মিনিটে দ্যা শিপ পাবে দেখা করার কথা। পত্রিকা অপিসে যাবার পথে স্টেফান তার ফুপু সারার সাথে দেখা করার কথা ভাবে। সে আন্ট সারার বাসায় যাবার পথে, পায়রার খাঁচা দেখে মনে করে একটি পায়রার মাধ্যমেই হয়তো ভার্জিন মেরী অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন। তার চিন্তা পরক্ষণেই মাতা মেরী থেকে আইরিশ ন্যাশনালিস্ট প্যাট্রিস এগান ও তার পুত্র কেভিন এগানের দিকে শিফট হয়। স্টেফান মনে করে তারা বন্য বক ছাড়া আর কিছু নয়।

আবারো তার চিন্তার টুইস্ট। স্টেফান ভাবে তার প্যারিসে বাসের কথা। প্যারিসবাসের ইতি হয় তার বাবার একটা টেলিগ্রামের মাধ্যমে, যেখানে লেখা ছিল দ্রুত ডাবলিনে ফিরে আসার জন্য, কারণ তার মা মৃত্যুশয্যায়। স্টেফানের মনে পড়ে বাক মুলিগ্যানের আন্টি তাকে দায়ী করেছে তার মার মৃত্যুর জন্য, কারণ সে মায়ের মৃত্যু আগে তার আত্মার মুক্তির জন্য প্রার্থনা করতে অস্বীকার করেছিল।

স্টেফান জলের প্রান্ত দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। দূরে মার্টেলো টাওয়ারকে দেখা যায়। সে মনে মনে আবারো প্রতিজ্ঞা করে যে, আজ রাতে কোন মতেই সে মুলিগান ও হাইনের সাথে ওই টাওয়ারে রাতযাপন করবে না। স্টেফান একটা বড় পাথরখণ্ডের উপর বসে। ওর দৃষ্টি যায় কিছু দূরে দু’জন মানুষের দিকে, যারা একটা কুকুরের কফিন বয়ে আনছে আর একটি কুকুর তাদের পিছু নিয়ে অনুসরণ করছে। স্টেফান ওদের দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ সে ভাবছে ড্যানিশ জলদস্যুরা কেমন করে সুদূর অতীতে এই সাগরতীরে অবতরণ করেছিল ডাবলিনকে আক্রমণ করতে।


কুকুরটার ঘেউ ঘেউ শব্দে স্টেফানের মনোযোগ ড্যানিশ জলদস্যুদের থেকে শিফট করে কুকুরের দিকে। তার ভয় করে। জয়েসের আজীবন কুকুরভীতি ছিল। এখানে স্টেফানের মাঝ দিয়ে তার সাইনোফোবিয়ার ইঙ্গিত দেন। মানুষ দু’জন ইতিমধ্যে দৃষ্টিসীমার আরো কাছে চলে আসে। সে দেখে তাদের একজন পুরুষ এবং অপরজন মহিলা। কুকুরটি কফিন শুকতে শুরু করলে পুরুষটি কুকুরটিকে ধমক দেয়। কুকুরটি থেমে যায় ও বীচের বালিতে প্রস্রাব করে বালি দিয়ে ঢেকে দেয়। এই দৃশ্য তার সকালের কল্পনাকে আবার ফিরিয়ে আনে, যেখানে সে দেখেছিল যে, তার মৃত দাদীকে একটি শেয়াল গর্ত করে কবর দিচ্ছে।

এবার জয়েস স্টেফানের চিন্তাকে নিয়ে যান গত রাতের স্বপ্ন দৃশ্যে। স্বপ্নে সে দেখেছিল একজন মানুষ একটি তরমুজ হাতে লাল কার্পেট দিয়ে হেঁটে তার দিকে আসছিল। সে স্বপ্নদৃশ্য থেকে মুহূর্তেই বের হয়ে আসে মহিলার দিকে তাকিয়ে। আর তার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ফাবেলী লেনের যৌনক্রীড়া করার কথা। মহিলা ও পুরুষটি স্টেফানের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। যাবার সময় তারা চকিতে তার টুপির উপর চোখ বুলায়। ঠিক তখনই তার মাথায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে কবিতার লাইন। সে মিস্টার ডেইজীর সংবাদপত্র অপিসের চিঠির উপর দ্রুত একটি কবিতা লিখে ফেলে। সদ্য লেখা কবিতাটির দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে ওখানে চিত্রিত নারীটা আসলে কে। আর তখনই সে চাপ অনুভব করে মূত্রত্যাগের। বীচের বালিতে সে ওই কর্মটি সারে, আর অনুভব করে কেউ একজন যেন তাকে অনুসরণ করছে। জুতা পায়ে গলিয়ে ফিতা বেঁধে সে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায়, আর ঘাড় বাঁকিয়ে পাশে তাকায় অদৃশ্য অনুসরণকারীকে সনাক্ত করার জন্য। স্টেফান দেখতে পায় দূরে একটা জাহাজ ক্রমশ এগিয়ে আসছে তীরের দিকে। জয়েস এভাবে এই জাহাজের বর্ণনা দিয়ে এই এপিসোড’টা শেষ করেন। তিনি লেখেন—He turned his face over a shoulder, rare regardent. Moving through the air high spars of three master, her sails brailed up on the cross trees, homing, upstream, silently moving, a silent ship.

(ক্রমশ)

পঞ্চমপর্বের লিঙ্ক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s