দেশান্তর এবং মেটাফর: গান ও গরিবির নাগরিক মোলাকাত প্রসঙ্গে :: সুমন রহমান




ভূমিকা: নগরগরিবের সাংস্কৃতিক পরিচয় সাম্প্রতিক বাংলা গানে কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, এই ছিল আমার ডক্টোরাল গবেষণার বিষয়। এই বিষয়বস্তুর মধ্যে আমি প্রবেশ করেছিলাম উল্টো দিক থেকে, অর্থাৎ ঢাকা শহরের “আরবান ফোক” নামক এক ধরনের পপ গানের চলটি আমার নজর কেড়েছিল প্রায় এক যুগ আগে। নগরগরিব তখনো আমার চিন্তার মধ্যে নেহাত একটি উন্নয়নমূলক উপাদান হয়ে ছিল। আমি কাজ করতাম বস্তিবাসীর স্বাস্থ্য, পয়োনিষ্কাশন, কিংবা বস্তি উচ্ছেদ ইত্যাদি নিয়ে। এসব মুহূর্তে যখনি বস্তির কোনো ডেরায় ঢুকেছি উন্নয়নপ্রভুর জরিপ অথবা সাক্ষাৎকারের ছাপানো ফর্দ নিয়ে, অবাক হয়ে দেখেছি এতটুকু ডেরার প্রায় এক তৃতীয়াংশ জুড়ে ক্যাসেট আর ক্যাসেটপ্লেয়ারের মনোরম ডিসপ্লে। আধা মনোযোগে, আধা কৌতুকে তাদের গান শুনেছি বসে বসে: অচেনা শিল্পী, অদ্ভূত গায়কী, বিদঘূটে সব গান! বাংলা গানের যে রুচি আমার তৈরি হয়েছে রবীন্দ্র-নজরুল-হেমাঙ্গ-সলিল-সুমন-অঞ্জনবাহিত বিস্তীর্ণ পলিমাটিতে, এই গান সেখানে খাপছাড়া। এই দাপুটে গানের ধারা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দাপুটে সংস্কৃতির ভেতর নিশ্চয়ই অনেক প্রতিপত্তি নিয়ে বেঁচে থাকবে, কিন্তু কেউ কি ভেবেছিল যে, গাজীপুরের কোনাবাড়ি থেকে প্রকাশ পাওয়া ইমনের এলবামের বিক্রিও লাখ ছাড়াবে, সিলটি শরীফের গানের সিডি বেচবার জন্য দেশের আনাচে কানাচে তার নামে আলাদা দোকান হবে, মমতাজের এলবামের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে, আর এই ‘এগজোটিক’ গানের বাজার বাংলাদেশের গোটা সঙ্গীতবাজারের প্রায় সত্তরভাগ দখল করে নেবে? আরবান ফোক গানের এই অগ্রযাত্রা নিয়ে নানান অবকাশে লিখেছি, ফলে বর্তমান পরিসরে সেই আলাপে বিস্তার ঘটাবার সুযোগ কম। বরং ঢাকায় নগরগরিবের সাংস্কৃতিক পরিচয় উৎপাদনে এই গান যেভাবে ভূমিকা রাখছে, সে বিষয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ হাজির করাই বর্তমান নিবন্ধের লক্ষ্য।

তবু অল্প করে না বললেই নয়। মধ্য-আশির দশক থেকে বাংলা গানের যে চলটি ভীরু ভীরু পায়ে হাজির হয়েছিল ঢাকাই সঙ্গীত বাজারে, সুনির্দিষ্ট করে বললে, মুজিব পরদেশীর আমি বন্দী কারাগারে অ্যালবামটির প্রকাশনার মধ্য দিয়ে, সেই গানের ধারা যে এত প্রভাববিস্তারী হয়ে উঠবে, তা কল্পনা করা তখন বেশ দুরূহই ছিল। আবদুর রহমান বয়াতী কিংবা কাঙালিনী সুফিয়ার মত কৃতি শিল্পীরাও এই পথ খোঁড়ায় বিস্তর ঘাম ঝরিয়েছিলেন, যদিও নিজেরা তেমন সাফল্য পাননি। এই গানের সূত্র ধরে মমতাজ হয়ে উঠলেন গরিবের বিনোদন সম্রাজ্ঞী, তাও আশির শেষ দিক থেকেই। আরো বহু বহু নাম উঠে আসতে থাকল গানের বাজারে, যাদের কথা কস্মিনকালেও কেউ ভাবেনি। এই গানের বিস্তর জনপ্রিয়তার সূত্র ধরেই নাগরিক উচ্চবর্গ সাংস্কৃতিক ভোক্তা হিসাবে নগরগরিবকে শনাক্ত করতে সক্ষম হল, যদিও এই শনাক্তকরণের পেছনে কৌতুক এবং অনুকম্পাই কাজ করেছে।


শহরমুখী গণ-অভিবাসনের প্রায় দেড় যুগ পরে নগরগরিবের সাংস্কৃতিক সত্তার এই পুনরাবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ইত্যবসরে, ফকির আলমগীর কিংবা আযম খান যখন সখিনা কিংবা সালেকা মালেকার গান করছেন, তখনো মধ্যবিত্ত তার অনুকম্পাসমেত নিজেকে এসব গানের ভোক্তা হিসেবে শনাক্ত করে এসেছে। যে গরিব সিটের পেছনে দোতারা লুকিয়ে ঢাকা শহরে সারাদিন রিকশা চালিয়েছে, দিন শেষে দোতারা খুলে বসেছে হাইকোর্টের মাজারে, ফকির কিংবা আযম সেই গরিবের শিল্পী ছিলেন না। গরিব তাদের কাঁচামাল ছিল বটে, ভোক্তা কখনোই ছিল না। এতকাল পরে যখন আরবান ফোক গানের সুস্পষ্ট জনপ্রিয়তার কল্যাণে ভোক্তা গরিবের পছন্দকে চিহ্নিত করা গেছে, সেখান থেকে কয়েকটি গান নিয়ে তাদের ব্যবচ্ছেদ করাই এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছি। আর সেটা আমি করতে চাচ্ছি নগরগরিবের দেশান্তর অর্থাৎ গ্রাম ছেড়ে শহরে আসার ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে সাংস্কৃতিকভাবে শনাক্ত করার অভিলাষ নিয়ে।


বাংলা পপের গরিব আবিষ্কার

বাংলা লোকগান ও বাউল গান বহু বছর ধরে শিক্ষিত শহরবাসীর নানান ঐতিহাসিক ও জাতীয়তাবাদী দেনা চুকিয়ে আসছে। এরকমই এক প্রয়োজনের জায়গা থেকে রবীন্দ্রনাথ বাউল ‘আবিষ্কার’ করেছিলেন বঙ্গভঙ্গের প্রাক্কালে। বাউল হয়ে উঠল অখন্ড বঙ্গের সিগনিফায়ার। আবার, যখন প্যান ইসলামি জাতীয়তা তৈরির কাল এল, তখন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের জনসভায় আব্বাস উদ্দীন দাঁড়িয়েছিলেন লোকগানের অমিত সম্ভার নিয়ে। ১৯৭১ এর প্যান ইসলামি স্বপ্নভঙ্গের কালেও সেই লোকগান কালুর ঘাটের রেডিও স্টেশন থেকে সমান উদ্যমে বাজতে থাকল। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে গানই হয়ে থাকল নাগরিক উচ্চবর্গের তরফে গরিব আবিষ্কারের হাতিয়ার। গানের গ্রাম এত সুন্দর, গানের গরিব এত বিপ্লবী!


যে গানের ইঙ্গিত উপরে দিচ্ছি তা মূলত পপ, কিন্তু লোকগানের ডালপালার মধ্যে এর বেড়ে ওঠার ঝোঁক। এই জনপ্রিয় কৃৎকৌশলের মাধ্যমে মেট্রোপলিটন মধ্যবিত্ত ‘শেকড়’-এ ফিরতে চায়। সে এই কৌশলের আবিষ্কারক, ভোক্তা তো বটেই। নগর গরিব এই কৌশলের বিষয়বস্তু। এভাবে, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের পপশিল্পীরা আদর্শ গরিবকে এঁকেছেন বিস্তর, যে গরিব সখিনার স্মৃতি নিয়ে রিকশা চালায়, ফুটপাতে ঘুমায়, গ্রামে সখিনার আঁচলে ফিরে যেতে চায়। শিক্ষিতের পপগান এভাবে গ্রাম, অভাব ও নগরগরিবকে চিনতে চেয়েছে।


গান ও দেশান্তরী জনগোষ্ঠী

তাত্ত্বিকেরা দেখিয়েছেন, গানের মাঝে দেশান্তরের ধারণা বড় বিচিত্রভাবে আসে। খুব প্রিয় প্রসঙ্গও এটি, গানের। বিভিন্ন ধরনের দেশান্তরী গোষ্ঠীর গান ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। বেইলি এবং কোলিয়ের (২০০৬) এক নিবন্ধে দেখাচ্ছেন যে, দেশান্তরী গোষ্ঠীর গানের ধরনটি কেমন হবে তা নির্ভর করে ঐ দেশান্তরী গোষ্ঠী কিভাবে তৈরি হয়েছে তার ওপর। তাছাড়া, কোনো দেশান্তরী গোষ্ঠীর গানের ধরন নির্ভর করে আরো নানা বিষয়ের ওপর: কী পরিমাণ ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব রচিত হয়েছে তার ছেড়ে আসা গ্রাম বা দেশের সাথে, আবার কী রকম ঘনিষ্ঠতা হয়েছে তার নতুন জায়গার সাথে, ইত্যাদি। ফলত বৃটেনে ভারতীয় ভাঙরা গান আর ঢাকায় গ্রামাঞ্চলের বাউলা গানের চেহারা, ফর্মেশন ও রাজনীতি এক রকম হবে না বলাই বাহুল্য।

রূপক বা মেটাফর হচ্ছে বাউল গানের প্রাণপাখি। প্রধান কৌশলও বটে। এর ফলে অধিকাংশ বাউল গান দুইটি অর্থ বহন করে। রূপকের বিস্তার থেকে গানের বাইরের অর্থটি পাওয়া যায়, আর এর তফসিরের মধ্যে লুকিয়ে থাকে গানের ভিতরের অর্থ। এহেন কৌশলটিকে অনেকেই ‘প্রতিরোধী’ বলে শনাক্ত করেছেন। অর্থাৎ, তাদের মতে, রূপক আমদানি করার মাধ্যমে বাউল গান ধর্ম, বর্ণ ও সমাজ সম্পর্কে বাউলদের র‌্যাডিকাল মতাদর্শ প্রচার করতে পেরেছে। ফলত এটা একটা সফল কৌশল। সফল বলেই এর পুনরাবৃত্তি দেখি আমরা আরবান ফোক গানে। বিষয়টিকে ভেঙ্গে বলা যাক।


রূপকের দুইটি অংশ: সিগনিফায়ার এবং সিগনিফায়েড। সিগনিফায়েড হল যাকে রূপকের মাধ্যমে বিবৃত করা হচ্ছে, আর সিগনিফায়ার হল সেই কৌশল যার দ্বারা সিগনিফায়েড বিবৃত হয়। এখন এই নিবন্ধে আমরা দেখব কীভাবে আরবান ফোক গানে বাউল গানের জনপ্রিয় সিগনিফায়েডগুলো নতুন নতুন সিগনিফায়ারের আশ্রয়ে নতুন রূপক তৈরি করছে। যেমন, আরবান ফোক গানে ‘যৌবন’ নামক সিগনিফায়েডখানা আর ‘কচুপাতার পানি’ নয়, বরং ‘গোল্ডলিফ সিগারেট’। একইভাবে, জীবন জিনিসটা ভবদরিয়ায় ভাসানো তরী বা নৌকা নয়, বরং হাইওয়েতে চলতে থাকা বাস; দুনিয়া আর দুইদিনের মঞ্চ নয়, বরং দুই মিনিটের বাসস্টপ। লোকগানে যিনি ছিলেন ‘প্রেমদরিয়ার মাঝি’, আরবান ফোকে তিনি হয়ে যান ‘তালার কারিগর’, ‘গাড়িয়াল ভাই’ হয়ে উঠেন ‘রিকশা ড্রাইভার’, মানুষকে বিপথে নেয়া ‘পঞ্চেন্দ্রিয়’ আরবান ফোক গানে ‘পাড়ার মাস্তান’-এর চেহারা পায়।


এই বদলে যাওয়াগুলো নিছক খেয়ালখুশির নয়। বরং তাদের শহরমুখী গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় বিনির্মাণের কৌশল হিসাবে শনাক্ত করা সম্ভব। স্টুয়ার্ট হল যেমন বলেন, শহরমুখী অভিভাসন অধিকাংশ সময়েই একতরফা, প্রত্যাবর্তনরহিত। অর্থাৎ গ্রামে ফেরত যাওয়ার যে স্বপ্ন, সেটা একটা মিথ। এডওয়ার্ড সাঈদ মনে করেন অভিবাসন জিনিসটা আসলে অভিবাসীকে একটি থমকানো দশায় ঠেলে দেয়, যার ফলে সে তার অতীতের সাথে বোঝাপড়া কখনই শেষ করে উঠতে পারে না। ঘুরে ঘুরেই তাকে ফিরে আসতে হয় স্মৃতির ভেতর। কিন্তু এই আসা-যাওয়ার ফাঁকে তাকে নতুন পরিস্থিতির ভাষাও আয়ত্ত করতে হচ্ছে। সেখানেও সে থমকানো সত্তা। আধেক অতীতে আর আধেক বর্তমানে বিভক্ত হয়ে থাকা এই দশাকেই হোমি ভবা নাম দিয়েছেন “ইন-বিটুইন” দশা। নিবন্ধের অন্তিমে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকবে।


এই দশার প্রকাশ যে ভাষাব্যবহারের ওপর পড়বে তা বলাই বাহুল্য। স্টিফেনস (১৯৯১) দেখিয়েছেন কিভাবে র‌্যাপ গানের চর্চার মাধ্যমে এই ঘরানার শিল্পী ও শ্রোতা মিলে মূলধারার সংস্কৃতির বিরূদ্ধে জাতির ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। বাখতিনের অনুসরণে স্টিফেনস (১৯৯১) দেখান কিভাবে র‌্যাপ সঙ্গীত একটা দ্বৈতস্বর হয়ে উঠছে, মূলত আফ্রিকান আত্মপরিচয়কে পশ্চিমা দুনিয়ায় ফিরে পাবার জন্য। উপন্যাসে ভাষাব্যবহারের ক্ষেত্রে বাখতিন মনোলজিক ও ডায়ালজিক নামক দুটি ঘরানা শনাক্ত করেন যেখানে ডায়ালজিক ঘরানা অন্য-র স্বরকে ধারণ করে। একে তিনি নাম দিয়েছেন ‘হেটেরোগ্লসিয়া’—’অন্যর ভাষায় অন্যর বক্তব্য’। এই কৌশলটির উদ্দেশ্য দুটো: উপন্যাসের চরিত্রটির সোজা সরল অভিপ্রায় এবং লেখকের বাঁকাচোরা অভিপ্রায়। গানে এই কৌশলটি কার্যকর হয়েছে কিছুটা ভিন্নভাবে। স্টিফেনস (১৯৯১) যেমন দেখিয়েছেন, দ্বৈতস্বর হয়ে উঠার মাধ্যমে র‌্যাপ মূলত আফ্রিকান ও আমেরিকান পরিচয়ের মধ্যে সেতুবন্ধ বানাতে চেয়েছে। বাউল গানেও এই ঐতিহ্য ছিল, আগেই বলেছি। আরবান ফোক এসে এই ঐতিহ্যকে একটু অন্যভাবে কাজে লাগিয়েছে। সেখানে বাখতিন কথিত ‘সোজা সরল অভিপ্রায়’ বলতে আমরা যা পাই, তা হল গরিবের নির্জলা নাগরিক অভিজ্ঞতা। ‘বাঁকাচোরা অভিপ্রায়’ আবার যত না আধ্যাত্মিক, তারচে রাজনৈতিক। বর্তমান প্রবন্ধের মূল অভিপ্রায় এই সাংস্কৃতিক রাজনীতিটুকু খোলাসা করা, মূলত তিনটি আরবান ফোক গানের লিরিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। গান তিনটি একে একে আলোচনা করা যাক।


‘জীবন এক গাড়ি’

বহু বছর ধরে লোকগানের পরিসরে জীবনের অবশ্যম্ভাবী রূপক হিসেবে আমরা ‘নৌকা’কে জেনে এসেছি। নৌকার বিভিন্ন অংশ জীবনের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমের রূপক হয়ে রয়েছে। সেইসাথে ‘নদী’ও কিন্তু জীবনের সহচর, কখনো কখনো জীবন নিজেই। নদী বিক্ষত প্রাণের কথাসঙ্গী, যাবতীয় গোপনীয়তার কৌটা, জীবনের মতই ছন্দে ও ছন্দহীনতায় প্রবহমান। এহেন শক্তিশালী রূপক আরবান ফোক গানের পরিসরে এসে গুরুত্ব হারিয়েছে, ‘নদী’ ও ‘নৌকা’র পরিবর্তে ‘গাড়ি’ ও ‘হাইওয়ে’ হয়ে উঠেছে জীবনের সিগনিফায়ার। নিচের গানখানি এর স্মারক:


পাংচার হইয়া গেলে চলবে না আর গাড়ি
হায়াতের তেল পাইবা না খুঁজলে জগত ভরি


২০৬ আর ৭২০০০এ তার চতুর্পাশে দেয়ালে যার কইরাছে তৈয়ারি
চলছে গাড়ি মন-গিয়ারে / ব্রেক দিছে বিবেক তারে
জ্ঞানের ড্রাইভারি করে মাওলা যে মিস্তিরি!


হেডলাইট করছ ইউজ /একদিন হইবে ফিউজ
রাখছ নি তার নিউজ ডাউন যে ব্যাটারি


চিন্তা করে দেখ বাপু/বন্ধ হলে মাউথ ভেঁপু
সুইচ দিলে করবে না কভু …. (অস্পষ্ট)



দুইপাশে দুই ইনডিকেটার / সার্ভিস দিতেছে বেটার
দুইজন কন্ডাক্টর করে গবমেন্টের চাকুরি


পাইয়াছ পিচ ঢালা রোড / করে চলছ ওভারলোড
সামনে তোমার মোবাইল কোর্ট ট্যাক্স আদায়কারী


কামগঞ্জ ত্রিবেণীর মোড়ে / বিবেকের ব্রেক ফেল করে
একসিডেন্টে রইল পড়ে শাহালমের গাড়ি


আজরাইল ট্রাফিক সার্জেন্ট / নিযুক্ত করেছে গবমেন্ট
ছাড়তে হবে ওয়ান্ডারল্যান্ড অতি তাড়াতাড়ি

(সরকার ১৯৯৯; মমতাজ ২০০০)

এই গানের ‘সোজা সরল’ অর্থ অতি পরিষ্কার: এক বাস ড্রাইভারের গল্প এটি, যে ওভারলোড যাত্রীভরা বাস নিয়ে হাইওয়েতে গিয়ে ব্রেকফেল করে পড়ে আছে। তার লোভ আর অবিচক্ষণতার গল্প। গভীরতর দ্যোতনা খুঁজলে বাস চালানোকে আমরা শনাক্ত করতে পারি জীবন চালানোর সাথে, যেখানে বিভিন্ন রকমের গিয়ার হল মনের নানান রঙ, ব্রেক হল বিবেক, টায়ার পাংচার মানে আয়ু ফুরানো, ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার, পেট্রোল বা ডিজেলকেও আয়ুর সাথে তুলনা করা হয়েছে এই গানে। সেইসাথে হেডলাইট তার দেখার ক্ষমতা, হর্ণ হল তার নিজেকে জানান দেওয়ার ক্ষমতা। গভীরতর যে অর্থ, তাতে বলা হচ্ছে যে আমরা যখন বিবেকচালিত না হয়ে ইন্দ্রিয়চালিত হই, তখনই দুর্ঘটনা ঘটে। জীবনের ইতি হয়, নয়তো সম্ভাবনার। ইসলাম ধর্মীয় পরিভাষায় আজরাইল সেই অবসানের দূত, আর হাইওয়ের ভোকাবলারিতে ট্রাফিক সার্জেন্ট। ফলে, সঙ্গত কারণেই এই গানে সার্জেন্ট আজরাইলের সিগনিফায়ার হয়ে এসেছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই গানে নৌকার বদলে বাস সিগনিফায়ার হয়ে এল? সমসাময়িক ঢাকার প্রেক্ষিতে এই বদল কেন অনিবার্য হয়ে উঠল? প্রকৃতপক্ষে, শহরে ভাগ্যবদল করতে আসা গ্রামীণ গরিবের পক্ষে সবচে সহজে কাজ খুঁজে পাওয়ার জায়গা হল এই পরিবহন সেক্টর। এখানে যেমন কম মজুরিতে বিভিন্ন ধরনের অদক্ষ শ্রমিকের (টিকেট কন্ডাক্টর, হেল্পার, কুলি, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ইত্যাদি) প্রয়োজন, তেমনি অল্প নোটিশে বিভিন্ন রকম আধাদক্ষ জনশক্তিও (টিকেট বিক্রেতা, বিভিন্নরকম দোকানদার, ভ্রাম্যমান বিক্রয়কর্মী ইত্যাদি) এখানে কাজ খুঁজে নিতে পারে। প্রতিটি বাসের নিজস্ব মিউজিক সিস্টেম আছে, ছোট ছোট দোকানদারেরও আছে সিডি কিংবা ক্যাসেটপ্লেয়ার—ফলে এখানে বিপুল পরিমাণ সঙ্গীত শ্রুত হয় বলাই বাহুল্য। বাস যখন চলে তখন গান বাজে, আবার বাস যখন সিরিয়ালে অলস সময় পার করে তখনও গান বাজে। আবার, আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলোতে শুধু যাত্রীই থাকে এমন না, বহুরকমের অযাত্রীও মিলে মিশে থাকে। হতে পারে সে বেকার, ভিক্ষুক, ঘরহারা কিংবা দেহজীবী – আশপাশের দোকান থেকে ভেসে আসা গান তাদের চারপাশে একটা স্বস্তির বলয় তৈরি করে। গানের ভেতরেই যেন তারা নিজেদের একটুকরো ব্যক্তিগত স্পেস খুঁজে নেয় এই জনপরিসরে।

ওপরে বিবৃত গানটি বাউল দেহতত্ত্বের একটা ক্লাসিক নমুনা। দেহতত্ত্ব মানবদেহকে তার আধ্যাত্মিক গুরুত্বের জায়গা থেকে ব্যাখ্যা করে। বাউলতত্ত্বে দেহ হল যাবতীয় জাগতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রবিন্দু। এই গানে দেহ প্রথমে জগতকে সিগনিফাই করেছে, দেহতত্ত্বের সব গানই যেমন করে। সেই সাথে, গাড়ির রূপকটি দেহকে সিগনিফাই করার মাধ্যমে পুরো জগত-তুলনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। জগতকে সিগনিফাই করার জন্য এভাবে এই গান একটি দ্বিস্তরবিশিষ্ট রূপকব্যবস্থা প্রস্তাব করে। একেই লাকাঁ বলেছেন ‘Chain of signifiers in the signification process’।7 প্রথম স্তরে, যেখানে দেহ জগতের রূপক হয়ে আসছে, সেটা পরিষ্কারভাবেই বাউল ঐতিহ্য। দ্বিতীয় স্তরে, যেখানে গাড়ি মানবদেহের সিগনিফায়ার হয়ে উঠল, সেটাই এই গানে আরবান ফোক ঘরানার সিগনেচার। নৌকাবদল করে গাড়ি এল, আর এটুকু অবকাশেই বলা হয়ে গেল গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দেয়ার ঐতিহাসিক বৃত্তান্তটুকু। স্টুয়ার্ট হল যেমন বলেন, আত্মপরিচয় জিনিসটা কোনো সাদামাটা নিস্তরঙ্গ পুষ্করিণী নয়, বরং বিপুল সংগ্রামের জায়গা, ঐতিহাসিকভাবে হয়ে উঠার জায়গা। এই গান যে কাহিনি বুনেছে ‘বাঁকাচোরা’ অভিপ্রায়ে, যাবতীয় আধ্যাত্মিকতা কিংবা দেহতাত্ত্বিকতার সাথে, সেটি নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবিকা হারানোর কাহিনি।


‘যৌবন একটা গোল্ডলিফ সিগারেট’

বাংলা গানের জনপ্রিয় বিষয়গুলোর তালিকা যদি করা যায়, তবে যৌবনের উদযাপন নিঃসন্দেহে উপরের দিকেই থাকবে। যৌবনের বিভিন্ন স্তর বিভিন্নভাবে রূপকায়িত হয়েছে গানে। লোক ঐতিহ্যে যৌবন হল ‘কচু পাতার পানি’। কচু পাতা যেমন পানি ধরে রাখতে পারে না, পানির ছাপ যেমন পাতার গায়ে চিরস্থায়ী হয় না, তেমনি জীবনের গায়ে যৌবনের ছাপ ক্ষণস্থায়ী। দারিদ্রপীড়িত গ্রামীণ যৌবনের জন্য এটাই মোক্ষম উপমা। কিন্তু আরবান ফোক গানে এই কচুপাতার পানি গোল্ডলিফ সিগারেটের ধোঁয়ায় বদল হয়ে গেছে।


যৌবন একটা গোল্ডলীফ সিগারেট
যৌবনের আগুনের ধোঁয়া নিভে গেলে সবই ভুয়া
জীবন হয় খালি প্যাকেট

যৌবনে বিহ্বলও নাকি হয়ে উঠে বীর
যৌবনে কানার চোখে স্বপ্ন করে ভিড়
এই যৌবনে বোঁ বোঁ করে বোবায়ও প্রেমের গান ধরে
হইয়া লাইলির ক্যান্ডিডেট


যৌবনে গুজায়ও নাকি চিৎ হইয়া ঘুমায়
যৌবনে এক কাউয়ায় আরেক কাউয়ারে চুমায়
কোরবানির ঐ গরু-খাসি যৌবনে পায় মূল্য বেশি
যৌবনে দামি গবেট


যৌবনে লুলায়ও নাকি লাত্থি মারতে চায়
যৌবনে ফুটবল খেলে একপায়ে ল্যাংড়ায়
যৌবনে শাহ আলম সরকার বাঁধিয়াছে রঙের সংসার
ভালবেসে রেডিমেড

(সরকার ১৯৯৯)


এই গানে সিগারেটের ধোঁয়া যৌবনের অস্থায়িত্ব পুনর্ব্যক্ত করে, আর ‘গোল্ডলিফ’ ব্রান্ড তার শহরমুখীনতা প্রতিপন্ন করে। এর আগে, যৌবন যখন ‘কচুপাতার পানি’ ছিল, সেই তারল্য দিয়ে নাগরিক যৌবনকে পুরোপুরি ব্যক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। এই গান যাদের চরিত্র আকারে উপস্থাপন করছে, সেইসব শারীরিকভাবে অসক্ষম মানুষের যৌবনকে নেহাত তারল্যের রূপক দিয়ে আটকানো যাচ্ছে না যেন, এটা রীতিমত উদ্বায়ী, ধোঁয়া হয়ে রাতারাতি উবে যাওয়ার জিনিস। বিষয়টাকে খোলাসা করা যাক।

সমাজতাত্ত্বিক বিবেচনায়, বাংলাদেশের শহর প্রেক্ষাপটে দারিদ্র, শারীরিক অসামর্থ ও ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের তরফে বলার মত কোনো সাহায্য নাই, যা দিয়ে সে তার জীবন নির্বাহ করতে পারে। নাই কোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনাও। কিছু কিছু এনজিও এই সেক্টরে কাজ করে, কিন্তু চাহিদার তুলনায় সেটা সিন্ধুতে বিন্দু যোগ করার মতই। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রতিবন্ধীদের প্রায় ২৬ শতাংশকে তাদের পরিবার জোর করে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামায়। মুষ্টিভিক্ষা বাউলদেরও চর্চার মধ্যে ছিল, কিন্তু বর্তমানের যে ভিক্ষা, তার মতাদর্শিক কোনো ভিত্তি নাই। এটা নিছক দারিদ্রপ্রসূত, শাহরিক এবং বাণিজ্যিক। ঢাকা শহরের ভিক্ষুকদের দিকে তাকালেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে উঠে। বাণিজ্যিক এজন্য যে, যে যত বেশি প্রতিবন্ধী, তার রোজগার তত বেশি। সঙ্গত কারণেই এর দুর্বৃত্তায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ হতে বাধ্য। ঢাকা শহরের ভিক্ষাবৃত্তির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বহুদিন হল মুষ্টিমেয় কিছু চক্র দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ভিক্ষা, অনেক ক্ষেত্রেই, এখন চাকরিবিশেষ। দৈনিক বা সাপ্তাহিক নির্দিষ্ট বেতনের বিনিময়ে প্রতিবন্ধীরা ঐ চক্রের দ্বারা শহরের লোভনীয় লোকেশনগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। আর দেড় কোটি মানুষের মেগাসিটিতে লোভনীয় লোকেশনের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ফলে শহরে প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকদের চাহিদাও প্রচুর। যোগান সবসময় চাহিদার সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যদি পাল্লা নাও দিতে সক্ষম হয়, সমস্যা নাই। যেকোন গরিবকে ধরে নিয়ে কৃত্রিম উপায়ে হাত-পা কেটে বা চোখ উপড়ে প্রতিবন্ধী বানিয়ে দেয়ার চর্চাও রয়েছে ঐ দুর্বৃত্তচক্রের। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক গল্প-উপন্যাস-চলচ্চিত্রে এই বাস্তবতার সন্ধান মেলে।১০

সেদিক থেকে বিচার করলে, এই গানটি মূলত প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর শহরায়নের অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করেছে। এটা করতে গিয়ে ‘যৌবন’ নামক ধারণাটিকে সিগনিফাই করার জন্য অত্যন্ত বিরল একটি সিগনিফায়ার উপস্থাপন করেছে। তারুণ্য বা যৌবনের গতিময়তাকে দাগিয়ে দিতে গিয়ে এই গান প্রতিবন্ধী দশাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যাতে তুলনার বোধ থেকে আমরা যৌবনের গতিময়তার আস্বাদটুকু পাই। এই বিশ্লেষণটিকে যদি আমরা নগরগরিবির প্রেক্ষিতে বিবেচনা করি, তাহলে এই গান যেমন যৌবনের সেলিব্রেশন, আবার তা একইসঙ্গে যৌবনের প্রত্যাখ্যানও। যৌবনের ক্ষণস্থায়িত্বকে সিগনিফাই করার জন্য এখানে এমন একটি কুশলী সিগনিফায়ার (সিগারেটের ধোঁয়া) ব্যবহার করা হয়েছে, যা গরিবের যৌবন বিবেচনায় নতুন মাত্রা আনে। যৌবন এমন একটি সমৃদ্ধির ইনডিকেটর, যা আমরা প্রায়শই গরিবের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে প্রস্তুত থাকি না। তার ওপর, সেই গরিব যদি হয় প্রতিবন্ধী, তাহলে সেখানে যৌবনের ধারণাটি রীতিমত অ্যাবসার্ড পর্যায়ে পৌঁছায়। সেরকম একটি বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে যৌবনের সেলিব্রেশন শুধু আরবান ফোক গানে নয়, বরং সব ধরনের গানের বিবেচনায় একটি বিরল নান্দনিক অর্জন। এর তুলনা বাংলা গানে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।


‘প্রেম একটা ক্রিকেট ম্যাচ’

এই ডুয়েট গানটি নারীপুরুষের প্রেমমূলক যোগাযোগ নিয়ে, একইসঙ্গে তা ক্রিকেট নিয়েও। এখানে নারীকণ্ঠ ও পুরুষকণ্ঠ পরস্পরকে পরস্পরের প্রেমে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে, কিন্তু সেজন্য তারা ব্যবহার করে ক্রিকেটীয় পরিভাষা। নারীর ভূমিকা এখানে বোলারের, আর পুরুষ হল ব্যাটসম্যান। পুরুষটি বলে যে, সে যদি এই নারীর ‘মন চুরি’ করতে সমর্থ হয়, তবে তাতে তার ‘ভালবাসার সেঞ্চুরি’ পূর্ণ হবে। নারীটিই বা পিছিয়ে রইবে কেন? সে পাল্টা জবাবে বলে যে, তার দিক থেকে সেটা হবে প্রেমের ‘ডাবল সেঞ্চুরি’। পুরুষটি জানায় সে ‘একদিনের ক্রিকেটে’ অর্থাৎ স্বল্পকালীন প্রেমে আগ্রহী, অন্যদিকে নারীর পছন্দ ‘টেস্ট’ অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী অ্যাফেয়ার। পুরুষ তখন তাকে প্রলুব্ধ করতে চায় এই বলে যে, একদিনের ম্যাচ খেলে খেলেই টেস্টেও যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। নারী তখন বলে যে, এ ধরনের ‘টাউট ব্যাটসম্যান’ সে অনেক দেখেছে এবং তাদেরও উইকেট নিতে তার অতীতে কোনো সমস্যাই হয়নি। পুরুষ বলে, সে বলে বলে বাউন্ডারি মারতে সক্ষম। নারী তাকে বরং উইকেটে মনোযোগী হতে পরামর্শ দেয়। পুরুষ বলে যে, সে নো-বল পেলে ছক্কা মারতে মোটেও ভুল করে না। নারী জানিয়ে দেয় যে, সে ওয়াইড বা নো-বল করেই না। এভাবে এগোতে এগোতে এই গানটি শেষ হয় এমন এক জায়গায় যেখানে এই প্রতিদ্বন্দ্বী নারী ও পুরুষ প্রেম জিনিসটাকে একটা সমবায়ী প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নেয়। (মমতাজ সহশিল্পী, প্রকাশসাল অজ্ঞাত)।

প্রথমত, এই গানটি কবিগানগোত্রীয়, যেখানে দুইজন শিল্পী তাদের যন্ত্রীদলসহ মঞ্চে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে হাজির হয় এবং দর্শন, খোদা, ইচ্ছার স্বাধীনতা, নৈতিকতা ইত্যাদি গুরুভার দার্শনিক তত্ত্ব নিয়ে গানে গানে বাহাস করে। এখানেও সেটা করা হয়েছে, কিন্তু বিষয় মোটেও গুরুভার নয়। প্রেমের খেলা জিনিসটা অতীতে নানাভাবে সিগনিফায়েড হয়েছে, কিন্তু ক্রিকেটীয় পরিভাষায় এবারই প্রথম। গানের সুরটাও নেয়া হয়েছে একটা পুরনো বাংলা গানের সুর থেকে। এখন কথা হচ্ছে, নারী পুরুষের এই প্রেম প্রেম খেলায় ক্রিকেটীয় পরিভাষা ব্যবহারের সাংস্কৃতিক রাজনীতি কী?

ক্রিকেট নিয়ে আপ্পাদুরাই (১৯৯৬) এর বিশ্লেষণটি আমাদের এক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। তিনি বলছেন, বৃটিশ-শাসিত ভারতে ক্রিকেট ছিল শাদা প্রভুদের সামাজিকীকরনের হাতিয়ার। আদতে এই জিনিসটাই একসময় ভারতীয় জাতীয়তাবোধের স্মারক হয়ে দাঁড়ায়। ক্রিকেটের লোকায়তকরণ হয় নানাভাবে: ভারতীয় ভাষায় ধারাবর্ণনা, বেসরকারি খাতের বিজ্ঞাপন এবং দর্শকের মনোযোগ ঘনীভূত রাখার যাবতীয় কৌশলগুলো একজোট হয়েই এক সময় ক্রিকেটকে একটা জাতীয়তাবাদী আদলে নিয়ে আসে।১১ বিভিন্ন শ্রেণীতে ও বয়েসে ক্রিকেটের গ্রহণযোগ্যতা কী ধরনের অর্থ উৎপাদন করেছে তা নিয়ে আপ্পাদুরাইয়ের বক্তব্য নিম্নরূপ:

১. উচ্চমধ্যবিত্তের কাছে ক্রিকেট হল তারকা উৎপাদন এবং উপভোগের ক্ষেত্রবিশেষ, সেইসাথে জাতীয়তাবোধেরও জায়গা, তবে সবই তাদের লিভিংরুমের টেলিভিশন স্ক্রীণের সাপেক্ষে।
২. শ্রমিক শ্রেণী ও নিম্নবর্গের তারুণ্যের কাছে ক্রিকেট হল দল গঠন ও দলভূক্তির হাতিয়ার; বিপুল আনন্দ ও সম্ভাব্য সহিংসতা এর উপজাত।
৩. গ্রামীণ দর্শকের কাছে ক্রিকেট হল তারকাদের জীবনে, জাতির নিয়তিতে এবং শহরের সামর্থে সামান্যতম হস্তক্ষেপ করার উছিলাবিশেষ।


দক্ষিণ এশিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ক্রিকেটের এই লোকায়তকরণ শুরু হয়েছে ভারতের থেকে কম করে হলেও এক দশক দেরিতে। আদিতে এটা ছিল শহরবাসীর খেলা, ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে গ্রামান্তরে। শহরাগত তারুণ্যের কাছে ক্রিকেট শুধুই দলগঠনের হাতিয়ার নয়, বরং তা এমন কৌশল যা গ্রামাগত তরুণের চারপাশে একটা পরিচিতির বাতাবরণ তৈরি করে, তার পরিচয়পত্র হিসাবে কাজ করে। এমন একটা শাহরিক খেলার পরিভাষায় দখল প্রদর্শন করার মাধ্যমে গরিব তার শাহরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও যোগ্যতা ব্যক্ত করতে সমর্থ হয়। অন্যান্য গানের মত এই গানেরও রূপকায়ন প্রক্রিয়া দুইস্তরবিশিষ্ট। প্রথমত, এই গান প্রেমকে একটা হালকা ও চিরস্থায়ী নয় এমন একটা ডিসকোর্স হিসেবে দাঁড় করায়। এর ফলে লোকগানে প্রেমের যে সিরিয়াস ও পাথরে-খোদাই ডিসকোর্স—তা থেকে নগরগরিবের প্রস্থান নিশ্চিত হয়। দ্বিতীয়ত, এই গান আরো বলে যে, প্রেম একটা নাগরিক খেলা তার পরিষ্কার বিধিবিধান আছে। এই ‘ভিন্ন’ প্রেমকে শহরে উদযাপন করতে গেলে তার পরিভাষায় অভ্যস্ত হতে হবে, সে কারণে ক্রিকেটের বিধিবিধান ও তার সৃজনশীল ভাষ্য এই গানে সিগনিফায়ার হয়ে এসেছে।


মদের দোকানদার ও খরিদদার

পরিবারপ্রথা ও সামাজিক বিধিনিষেধের বেড়াজালে ব্যক্তির মুক্তি সুদূরপরাহত হয়ে ওঠে, বাউল সমাজে এটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা। ফলে, সংসার কিংবা পরিবারের কারাগার থেকে মুক্তি বাউলচর্চার আরাধ্য জিনিস। সংসারজীবনকে সে কল্পনা করে এসেছে এমন এক নৌকা হিসাবে যার ছয়জন মাঝিমাল্লা। এই ছয় মাঝিমাল্লা ছয় ইন্দ্রিয়ের রূপক। তারা ছয় দিক থেকে ছয়রকম অজুহাতে ব্যক্তিকে বেঁধে রাখে সংসারের ফাঁদে, ফলে তার আত্মার মুক্তি আর হয় না। আবদুল আলীমের বিখ্যাত গানে:

একে আমার ভাঙা তরী
মাল্লা ছয়জন সল্লা করি’
আমার নায়ে দিল কুড়াল মারি

এই জনপ্রিয় রূপকটি দেশান্তরী গরিবের নগরজীবনে বদলে যায়। ছয় মাঝিমাল্লার অন্য চেহারা আমরা দেখি মাতাল রাজ্জাকের
গানে:


যত মাতাল বৈতাল চিরকাল করে ওরা আমার ওপর অত্যাচার
মদ বেচা দোকানের চাকরি চাই না আর


আমার ঘরে স্ত্রী কালবাঘিনী রাত্রভরা হিরোয়িন খায়
তাতে কিছু কম পড়িলে বারে বারে চোখ রাঙ্গায়
যদি কই আবগারি মাল অমনি মারে ভাল
আমি হই কত নাজেহাল সামান্য এক দোকানদার


আমার কপাল দোষে ছেলে হাসে বাংলা খায় বেশি বেশি
তারে উচিত কিছু কইতে গেলে মারতে আসে কিলঘুষি
মাইয়া চায় পুরা বোতল তার সংসারই সকল
না পাইলে মাল ডবল ডবল মুখখানা তার করে ভার


আমার মস্ত লোভী ভাইভাবী ওরা দেখায় শুধু দেখায় জোর
হিতাহিত জ্ঞানছাড়া ওরা মস্ত গাঁজাখোর
তার ওপরে লোভ লালসা আছি বড় কোণঠাসা
ভ্যান ভ্যান করে মাছিমশা এই দুর্গন্ধ সয় না আর


এই দেহের দশ ইন্দ্রিয় অতি প্রিয় থাকে নেশার চোটে বেসামাল
চিরদিনের অভ্যাসে খাইতে আসে বাকি মাল
ওরা দেয় গালাগালি পড়ে নিশাতে ঢলি
আমার সাধ্য নাই কিছু বলি সব শালায় দুরাচার


করলাম একটানা চল্লিশ বছর মাইনা ছাড়া চাকুরি
আসল ঘরে মশাল খাইয়া পাকাইলাম চুলদাড়ি
মাতাল রাজ্জাকেরই কপালদোষে পাড়ঘাটাতে কান্দি বসে
সকাল সকাল চললাম দেশে সংসারপদে নমস্কার

(রাজ্জাক, তারিখ অজ্ঞাত)


এই গানে মদের দোকান পার্থিব জীবনের যাবতীয় আকর্ষণের রূপক হয়ে উঠেছে। দোকানের বিভিন্ন আইটেম, যথা,অ্যালকোহল, হেরোয়িন, গাঁজা ইত্যাদি নেশাদ্রব্য ব্যক্তিকে বেঁধে রাখছে সংসার নামক মদের দোকানে। এই গানের যে প্রোটাগনিস্ট, দোকান কিন্তু তার নিজের নয়। সে চাকরি করে মাত্র। তাও নিতান্ত অনিচ্ছায়। অনিচ্ছায় বেদনায় দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে তাকে নেশাদ্রব্য সরবরাহ করতে হয় আপনজনদের কাছে। এমন কি নিজের কাছেও। অর্থাৎ গানের ন্যারেটর আর নেশাখোর ব্যক্তিসত্তা আদতে একজন হলেও বিভাজিত সত্তা। সত্তার একাংশ সংসার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পেরেছে বলেই মদের দোকানের চাকরি এত অসহ্য হয়ে উঠেছে তার কাছে। এর থেকে মুক্তি চায় সে।


এই গানের মূল অভিপ্রায় নিশ্চয়ই বাউলচর্চিত আত্মার মুক্তি বা মোক্ষ, কিন্তু বাঁকাচোরা অভিপ্রায় অন্য। তৃতীয় বিশ্বের বস্তিগুলো মাদকব্যবসার আখড়া বলে অনেকেই জানেন। অনেকেরই ধারণা বস্তিবাসীরা মাদকের ব্যবসা করে, কিন্তু আদতে জিনিসটা ঘটে ভিন্নভাবে। মাদক ব্যবসার যে সিন্ডিকেট তা অনেক বড় এবং এর সাথে সমাজের উপরতলার মানুষেরাই যুক্ত। এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট মূলত খুচরা বিক্রির আউটলেট হিসাবে বস্তিকে বেছে নেয় এবং বস্তিবাসীকে এই ব্যবসায় নিয়োগ করে। এভাবে মাদক ব্যবসা পরিচালনার জন্য একটা জটিল নেটওয়ার্ক প্রয়োজন হয় যেখানে পুলিশবাহিনিসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোক অংশ নিয়ে থাকে। বস্তিবাসী এই শৃঙ্খলের শেষ মালা এবং এই পর্যায়ে এসে বিক্রেতা ও ভোক্তার পার্থক্য ঘুচে যায়। বা ঘুচিয়ে দেয়া হয়, ব্যবসায়িক স্ট্র্যাটেজির অংশ হিসেবে। এভাবে, মাদক নেটওয়ার্কে যোগদানের ফলে গরিবের আয়-রোজগারের সুরাহা হলেও চূড়ান্ত বিচারে সেইই এই ব্যবসার সবচে দুর্ভাগা শিকার। কারণ, গোপনীয় ব্যবসা চালাতে পারিবারিক ব্যুহ দরকার পড়ে। অর্থাৎ পরিবারের সবার অংশগ্রহণেই এই ব্যবসা চালাতে হয় তাকে। এভাবে ক্রমে ক্রমে বিক্রেতা ও ভোক্তার পার্থক্য ঘুচে যায় অনেকেরই। আগেই বলেছি, মাদক সিন্ডিকেটের জন্য এটা সুখবর, কারণ এতে করে তার ব্যবসা টেকসই হয়। ফলে এই ঘুচে যাওয়া কতটা স্বতঃস্ফূর্ত আর কতটা পরিকল্পিত এটা ঠাহর করা মুশকিল।

আগেই বলেছি, এই গানটির মূল অভিপ্রায় ইন্দ্রিয়ানুভূতির খপ্পর থেকে আত্মাকে পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু সেটা করতে হচ্ছে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, যখন নৌকা কিংবা মাঝিমাল্লা আর তার জীবনে নতুন কোনো অর্থ উৎপাদন করে না। পাশাপাশি, নতুন অভিজ্ঞতাগুলোকে গানে পুনরুৎপাদন করার চাপ আছে। প্রয়োজন আছে শহরবাসীর ঢালাও অভিযোগের (বস্তি মাদকের আখড়া)
জবাব দেয়ার। মেটাফোরের এই যে বদল, তা থেকে কিন্তু নগর গরিবির এই বাস্তবতাটুকুকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।


দেশান্তর ও মেটাফর: সাংস্কৃতিক যোগাযোগ

গানের বাস্তবতাকে সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করার বিপদ কিছু আছে। এতে মনে হতে পারে যেন একটা অন্যটার উপজাত, বা এদের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক আছে। প্রকৃতপক্ষে, সেরকম কিছু কার্যকারণ খুঁজে বের করা এবং গানের বাস্তবতাকে সামাজিক বাস্তবতা দিয়ে ঐতিহাসিকভাবে সমর্থন করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য জোগাড় করা মুশকিল। ফলে, বাস্তবতা এরকম ছিল বলেই এমন গান লেখা হয়েছে, এটা বলা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। এই লেখা মূলত কিছু গানের বিষয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে এমন কিছু বাস্তবতার হদিস করতে চেয়েছে, যা দিয়ে বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা যায়। গানের বাস্তবতা আর সমাজ বাস্তবতার যেখানে মেলবন্ধন হয়, তা কার্যকারণপ্রসূত হোক বা না হোক, আমাদের বিরল কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়। এই ডিসকার্সিভ মুহূর্তগুলোকে আমরা হোমি ভবার অনুসরণে হাইব্রিড মুহূর্ত বলে শনাক্ত করতে পারি। হোমি ভবা (১৯৯৬) বলছেন, দুটি সাংস্কৃতিক চর্চার এরকম মিলনমুহূর্তগুলোতে এক ধরনের অন্তর্বর্তীসংস্কৃতি (in-between culture) তৈরি হয়, যার সাথে তার উৎস ও গন্তব্য-সংস্কৃতির বিস্ময়কর মিল ও অমিল রয়েছে।১২

এই পাটাতনে ফেলে আমরা যদি আরবান ফোক গানকে বিবেচনা করতে যাই, তাহলে দেখবো যে এই গান কোনোভাবেই আর লোকসঙ্গীত নয়, আবার মূলধারার পপ বলেও তাকে শনাক্ত করা যায় না। সে কিন্তু এই দুয়ের মধ্যেই আছে, তবু কেউ তার নয়। নগরগরিবের আত্মপরিচয়ের রাজনীতিও একইরকম ব্যাকরণ অনুসরণ করে: না সে গ্রামের, না শহরের, যে জন আছে মাঝখানে! শহর তার পরিচয় নির্মাণের দায়িত্ব নিরঙ্কুশভাবে নিতে পারে না, যেহেতু প্রত্যাবর্তনের বাসনা তার অন্তরের অন্তঃস্থলে চিরকাল বিরাজ করতে থাকে। আবার তার যত গ্রামীণ স্মৃতি ও মুহূর্ত, সেসবের পুনর্নির্মাণে শহরের অভিধান নানান গলিঘুপচি দিয়ে ঢুকে পড়ে। যার ফলে শহরে অভিবাসনের মুহূর্তটি তার জীবনের সবচে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়। এটিই তার পরবর্তী জীবনের গতিধারাকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। বস্তিবাসীদের সাথে বিভিন্ন সময়ে আমার নিবিড় আলাপচারিতা থেকেও এমন ধারণার সপক্ষে আমি স্পষ্ট সমর্থন পেয়েছি।

যদিও অভিবাসন নগরগরিবের জীবনে নির্ণায়ক মুহূর্ত, সে বিষয়ে তারা সোজাসাপ্টাভাবে কথা বলে কম। আমার গবেষণার অংশ হিসেবে যখনি আমি এদের জীবন-ইতিহাস সমীক্ষা করতে গেছি, দেখেছি জীবনকে এরা স্পষ্টভাবে দুইভাগে ভাগ করে: অভিবাসন-পূর্ব এবং অভিবাসনোত্তর। তবে তারা গল্পটা শুরু করে শহরে পা দেয়ার মুহূর্ত থেকে। কিন্তু যখনি আমি তাদের অভিবাসন-পূর্ব জীবনের খোঁজ করতে যাই, তখন থেকেই তাদের গোটা আলাপটা দুই পর্বে বিভক্ত হয়ে যায়। এই বিভাগ কখনো কখনো রীতিমত জ্ঞানতাত্ত্বিক, এই অর্থে যে, তারা তাদের অভিবাসন-পূর্ব জীবনকে বিবৃত করতে গিয়ে প্রায়শই পরিভাষা হাতড়াতে থাকে, এবং খুঁজে খুঁজে শহরসংশ্লিষ্ট শব্দাবলী দিয়ে বর্ণনা করতে চায় তাদের ফেলে আসা গ্রামীণ জীবনের। হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে যেন তারা শহুরে গবেষকের কাছে বোধগম্য করে গ্রামীণ জীবনকে বর্ণনা করতে গিয়ে এমনটা করছে। কিন্তু এই খোঁজ আশলে তার নিজের জন্যই। বর্তমানের শাহরিক অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে অভিবাসন-পূর্ব স্মৃতিগুলোকে যাচাই করার প্রক্রিয়া এটি, ঘটনাচক্রে কোনো শহুরে গবেষকের সামনে ঘটছে মাত্র।

আরবান ফোক গানে রূপকের যে পুনর্বিন্যাস, তাকেও এই যাচাই প্রক্রিয়ার অংশ ভাবার ন্যায্য কারণ আছে। গানকে যেমন এরা কর্মময় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ভাববার রেওয়াজ লোকগানের ঐতিহ্য থেকে পেয়েছে, তেমনি আবার অতীতের খোড়লে ঢুকে লোকগানের রামরাজ্যে অবিচ্ছিন্নভাবে বিরাজ করবার বিলাসিতাও নগরগরিবকে মানায় না। ফলে এই সংকরদশা, যা দিয়ে তারা তাদের দুই জীবনকেই (অভিবাসন-পূর্ব এবং অভিবাসনোত্তর) একইসঙ্গে স্বীকার ও অস্বীকার করতে পারে। এই কৌশল একইসঙ্গে আবার প্রতিরোধীও। গণসঙ্গীতের মত বিপ্লবী খোয়াব আরবান ফোকে নেই, সরাসরি প্রতিবাদও বিরল জিনিস এই ঘরানার গানে। কিন্তু রূপকের ভেতর কসমেটিক সার্জারি করার মাধ্যমে এই গান এক ধরনের প্রতিরোধী অবস্থা জারি রাখতে চায়। লক্ষণীয় যে, যেসব রূপকগুলোতে এই সার্জারি চলেছে সেগুলো সুপরিচিত। এরকম প্রতিষ্ঠিত রূপককে যখন এই গান ভিন্নভাবে পরিবেশন করে, তখন তা শিক্ষিত শ্রোতার গানশোনার অভ্যাসের মধ্যে এক ধরনের অস্বাচ্ছন্দ্য তৈরি করে। একই সঙ্গে চেনা ও অচেনা লাগে এই গানকে। ফলে, মূলধারার এত নৈকট্যে থাকার পরেও এই গানের চর্চা, হোমি ভবার ভাষায়, একটা ‘আংশিক সংস্কৃতি’ হয়ে বিরাজ করে; জাতীয় সংস্কৃতির হেজিমনিক বাতাবরণে বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্যকে লুকিয়ে থাকতে দেয় না।

লেখক-পরিচিতি:

সুমন রহমান

সুমন রহমান। কবি, গল্পকার। জন্ম ৩০ মার্চ ১৯৭০, ভৈরব। ফিলসফি ও ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ-এ স্নাতকোত্তর, যথাক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ডক্টোরাল গবেষণা করছেন সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল কালচারাল স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায়। বিষয়: পপুলার মিউজিক।

টীকা ও তথ্যসূত্র

১ মাকসুদ, ব্যক্তিগত কথোপকথন
২ রহমান (২০১১)

3 Baily and Colier 2006: 172
4 Sarker 1990: 39

5 Said 1990, 357-63
6 Bakhtin 1981: 324

7 Lacan 1970: 194

8 Hall 1996: 156
9 http://www.thedailystar.net/newDesign/news-details.php?nid=145472

১০ ২০১০ সালের অস্কার পাওয়া ভারতীয় মুভি ‘¯স্লামডগ মিলিওনিয়র’ এ এরকম একটি উপকাহিনির সন্ধান পাওয়া যায়। তার আগে, বাংলা
ভাষার গল্প উপন্যাসেও এর হদিস মেলে। ১৯৭০ সালে প্রথম প্রকাশিত মাহমুদুল হকের গল্প ‘সপুরা ও পরাগল’ এর কাহিনিটি মূলত এরকম
একটি ঘটনা নিয়েই (হক ২০০০)। বাস্তবেও এ ধরনের বহু প্রচেষ্টা উদঘাটিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে ।

11 Appadurai 1996, 92

12 Bhabha 1996, 55


—————

Appadurai, Arjun (1996), Modernity at Large: Cultural Dimension of Globalization, Minneapolis: University of Minnesota Press.

Baily, John & Collyer, Michael (2006), Introduction: Music and Migration, Journal of Ethnic and Migration Studies, 32:2, pp. 167-82.

Bakhtin, M. M. (1981), The Dialogic Imagination: Four Essays, (ed. M. Holquist; trans. C. Emerson & M. Holquist), Austin : University of Texas Press.

Bhabha, Homi K. (1996), ‘Culture’s In-Between’, in Stuart Hall & Paul duGay (eds), The Questions of Cultural Identity, London: Sage, pp. 53-60.

Hall, Stuart (1996), “Who Needs ‘Identity’?”, in Stuart Hall & Paul duGay (eds), The Questions of Cultural Identity, London: Sage, pp. 1-17.

Lacan, Jacques (1970), ‘Of Structure as an Inmixing of an Otherness Prerequisite to Any Subject Whatever’, in R. Macksey & E. Donato (eds), The Languages of Criticism and the Sciences of Man: The Structuralist Controversy, Baltimore and London: The John Hopkins Press, pp. 186-94.

Said, Edward W. (1990), ‘Reflections on Exile’, in R. Ferguson, M. Gever, T. Minh-ha and C. West (eds), Out There: Marginalization and Contemporary Culture, Cambridge: MIT Press, pp. 357-66.

Stiphens, Gregory (1991), ‘Rap Music’s Double-Voiced Discourse: A Crossroads for Interracial Communication’, Journal of Communication Inquiry, 15:2, pp. 70-91.

রহমান, সুমন (২০১১) কানার হাটবাজার, ঢাকাঃ দুয়েন্দে পাবলিকেশনস ।

হক, মাহমুদুল (২০০০) প্রতিদিন একটি রুমাল, ঢাকাঃ সাহিত্য প্রকাশ ।


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s