জেমস জয়েস’র ইউলিসিস (পর্ব-৭) :: পায়েল মণ্ডল

ulysses-174

এপিসোড—৩ (প্রটিয়াস): স্ট্রিম অফ কনশাসনেসের এমন অনবদ্য লেখনী যা এই এপিসোডে লেখা হয়েছে, তা অন্য কোনো লেখকের লেখায় পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। জয়েস ভাষার কুলীনতা ভেঙ্গে দেন, তিনি সৃষ্টি করেন তাঁর নিজের ভাষা, যাতে মানা হয় না ব্যাকরণ। তিনি নির্মাণ করেন নতুন নতুন শব্দ একাধিক শব্দ একত্রিত করে। আর এক স্ট্রিম অফ কনশাসনেসের ধারক ভার্জিনিয়া উলফ কিন্তু জয়েস থেকে একেবারে ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি জয়েসের মত কোনো এক্সপেরিমেন্টে যান না।

এপিসোড তিন-এ আমরা দেখি মাত্র একটি এ্যাকশন আর বাকী অংশ জুড়ে বর্ণিত হয় স্টেফান ডেডেলাসের চিন্তাপ্রবাহ। তার মনোলগ, ডায়ালগ,  অন্তর্জগতের কথোপকথন।  স্টেফানের ভাবনা সরলরৈখিক ভাবে এগোয় না বরং সেটা এগোয় হঠাৎ দিক বদলে। জয়েস চিন্তার জিগ’স প্যাঁচগুলোকে একে একে জোড়া দিয়ে ভাবনার একটা অবয়ব নির্মাণ করেন পাঠকদের জন্য। চিন্তাকে চিত্রিত করেন প্রতীকী শব্দে। প্রতীকী শব্দে বিশ্লেষণ করেন দর্শন। তিনি সৃষ্টি করেন এক নতুন ভাষা, জয়েসিয়ান ভাষা। আর এখানেই জয়েস ও অন্য স্ট্রিম অফ কনশাসনেসের লেখকদের মাঝে নিজের অনন্য পার্থক্য আঙ্গুল দিয়ে সগর্বে দেখিয়ে দেন। তিনি বুঝিয়ে দেন তিনি এক এবং একক।

জয়েস স্টেফানের মনোজগত এমন ভাবে বর্ণনা করেন যেন পাঠকরা শুধু তার মনোজগতের কথা পাঠ না করেন বরং তারা স্টেফানের মনোজগতের আশা, হতাশা, দ্বন্দ্ব, প্রশ্ন, উত্তর, দার্শনিক ভাবনা, সব কিছুকেই যেন ছায়াচিত্রের মত দেখতে পান। এখানেও জয়েস অনন্য। তিনি শব্দকে রঙ আর কলমকে তুলির মত ব্যবহার করে মানুষের অর্ন্তজগতের প্রবাহমান চিন্তাকে পেইন্ট করেন এক বিশাল ক্যানভাসে।

এপিসোডের প্রথম বাক্য ‘Ineluctable modality of the visible’  স্মরণ করিয়ে দেয় এ্যারিস্টটলিয়ান দর্শনের কথা।  ‘আমরা যা দেখি তার বাহিরেও না দেখা অনেক কিছু থেকে যায়!’  এ্যারিস্টোটটলের মতে শ্রবণীয় শব্দ ও চোখে দেখার মাঝে পার্থক্য আছে। আমাদের শ্রবণ ইন্দ্রিয়ে কোনো শব্দ একক ভাবে প্রবেশ করে না বরং আমাদের চারপাশের একাধিক শব্দের মিশ্রণ আমরা শ্রবণ করি। দর্শনের (visibility) ক্ষেত্রে তা ভিন্ন। আমরা একক বস্তুকে দর্শন করতে পারি এবং ঐ বস্তুর বাইরে থাকা অদৃশ্যমান বস্তু নিয়ে চিন্তা করতে পারি। জয়েস পাঁচ শব্দে এক বিশাল দার্শনিক ভাবনা স্টেফানকে দিয়ে ভাবান।

‘Signature of all things..’  জয়েস জার্মান মিস্টিক জ্যাক বোহেমের ধারণাকে স্টেফানের অবচেতন মনের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। বোহেম মনে করতেন যে কোনো ধারণা নির্মিত হয় একটা বিপরীত ধারণার প্রেক্ষাপটে। স্টেফান চোখ বন্ধ করে এবং চোখ খুলে দেখে সে স্যান্ডিমাউন্ট স্ট্রান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। স্টেফান অনুভব করে স্যান্ডিমোর স্ট্রান্ডের বস্তুগত দৃশ্যমানতার বাইরেও এর আর একটি অস্তিত্ব আছে। জয়েস ওই অদৃশ্য অস্তিত্বকে বোঝাতে একটি মাত্র শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেটা হল—‘Signature!’
আর প্রকৃতির ওই অদৃশ্যমানতাকে জয়েস প্রকাশ করেন এভাবে—‘Limits of the diaphane…. diaphane audiaphane….!’ এ্যারস্টোটল এই অদৃশ্যমানতাকে প্রকৃতির একটা অংশ হিসাবে ধারণা করেন, তবে সেটা কোনো অবস্থানের সীমাবদ্ধতায় বদ্ধ নয় বরং তা প্রকৃতির সর্বত্র বিরাজমান অনুষঙ্গ!

স্টেফানের চিন্তা ইউ-টার্ন  নিয়ে বিশপ বার্কলে এবং তার মতবাদের উপর নিবদ্ধ হয়। বার্কলে মনে করেন মহাবিশ্বের কোনো বস্তুই মানুষের মনের বাহিরে নয়। স্টেফান ভাবে কেমন ভাবে এ্যারিস্টটলের মতবাদ বার্কলের ধারনাকে নাকচ করে দেয়। জয়েস স্টেফানকে দিয়ে ভাবান—‘No such thing as matter! Ha! Look, I just kicked the stone now my toe hurts! I refute you! There is such a thing as matter!’   পরক্ষণেই সে দান্তে থেকে এ্যারিস্টোটল সম্পর্কে কোট করে—‘The master of all those that know!’  এর পরেই সে প্রথম ইংরেজি অভিধানের প্রণেতা স্যামুয়েল জনসনের ‘gate’ এবং ‘Door’ শব্দের পার্থক্য নিয়ে ভাবতে শুরু করে। জয়েস স্টেফানের চিন্তার মাধ্যমে জানান যে আমাদের কল্পনা হল  ‘গেট’ এবং কল্পনার ভেতর দিয়ে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার প্রক্রিয়া হলো —‘ডোর!’  স্টেফান চোখ বন্ধ করে এবং উপলন্ধি করতে চায় তার দৃষ্টির বাহিরে বাস্তব জগত তার মনের চোখে কেমন ভাবে ধরা দেবে।

(ক্রমশ)

ষষ্ঠ পর্বের লিঙ্ক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s