ফরমালিনশালীন :: অমিতাভ পাল

mackerel-fishes-juan-bosco

আজকাল পচা মাছ কেনার জন্য বাসার লোকের বকা আমাকে খেতে হয় না বললেই চলে। বরং আয়েশ করে মাছ খেতে পারি। কিন্তু অবস্থাটা এরকম ছিল না বছর দশেক আগেও। তখন প্রায়ই মাছ কিনে আনন্দ আর উৎফুল্লতায় ভরে উঠে একটা নির্ভার বেলুনের মতো বাসায় ফেরার পর চুপসানো বেলুনে পরিণত হতে আমার দেরি হতো না। কারণ ওই মাছ। চকচকে খোলসের ভিতরে তারা ঢেকে রাখতো তাদের পচা শরীরটাকে। আর আমার সব অভিজ্ঞতাকে বুড়া আঙুল দেখিয়ে তারা ডাস্টবিনে চলে যেতো হাসতে হাসতে। আর আমরা সপরিবারে একটা আমিষহীন রাত্রি যাপন করতাম কেবলমাত্র আমারই দোষে।

তবে এখন অবস্থার অনেক বদল হয়েছে। চারদিকে প্রচুর মৎস্যখামার আর তাদের উৎপাদিত পণ্যে বাজার ভরা। ফলে মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে যাওয়া বাড়তি মাছের পরিমাণটাও বেড়েছে অনেক। এই মাছগুলি নষ্ট হয়ে গেলে সবার ব্যবসাই যে লাটে উঠবে- সেটা বলতে কোনো বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। কিন্তু, এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? পথ দেখালো বিজ্ঞান। জানিয়ে দিল, পচন ঠেকাতে পারে ফরমালিন নামের একটা জিনিস। এটা মাছের শরীরে মেখে দিলে বেশ রয়ে-সয়েই ব্যবসা চালানো যাবে। ব্যাপারটা যে শুধু ব্যবসায়ীদের বাঁচিয়েছে- তা না, বরং আমাকেও বাঁচিয়েছে পচা মাছ কিনে ধমক খাবার হাত থেকে।

তারপর থেকেই ফরমালিনমাখা টাটকা মাছ খেয়ে যাচ্ছি আমরা আর মাছে-ভাতে বাঙালি আপ্তবাক্যটার যথার্থতা প্রমাণ করে যাচ্ছি প্রতিদিনই।

এরমধ্যেই আমার এক পুরানো বন্ধুর সাথে অনেকদিন পরে দেখা হয়ে গেল। বন্ধুটা ছিল পাজির পা ঝাড়া। হেন দুষ্কর্ম নাই যা সে করতো না আর আমরাও অম্লানবদনে সবকিছু সহ্য করে যেতাম প্রথমত সে বন্ধু বলে আর দ্বিতীয়ত চারপাশের সমস্ত অন্যায় ও দূর্নীতি সহ্য করার এবং নিজেদের নিরবতা ও অপারগতাকে গণ্য না করার ক্ষমতা ততদিনে আমাদের জন্মে গিয়েছিল বলে। এইখানে বলে রাখি, বন্ধুটির দুষ্কর্ম কিন্তু বালক বয়স থেকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দিকে অভিযোজিত হয়েছিল সময়ের সাথে সাথে।

তো সেই বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার মিনিট দশেক পরেই আবিষ্কার করলাম একটা অদ্ভুত ব্যাপার। আমাদের সেই ভয়ংকর পাজি এবং দুষ্কর্মের হোতা বন্ধুটি পাল্টে গেছে পুরাপুরি। দিনের বেলায় হঠাৎ রাত নেমে এলে তবু বিশ্বাস করা যায়, কিন্তু বন্ধুটির এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারছিলাম না মোটেই। কিন্তু, আমার ইচ্ছায় তো আর পৃথিবী চলে না, ফলে বাধ্য হয়ে বিস্ময়ের পুকুরে সাঁতার না জানা বালকের মতো হাবুডুবু খেতে খেতে তার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থাকলাম।

বন্ধুটিও স্বাভাবিকভাবেই টের পেয়েছিল আমার বিস্ময়। হাসছিল মিটমিট করে। কিন্তু, সেই হাসিতে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো কোনো কারণ খুঁজে না পেয়ে বাধ্য হয়েই তার কাছ থেকে বের করতে চাইলাম এই পরিবর্তনের কারণ।

‘ফরমালিন’, বললো বন্ধু। ‘ওটাই আমার পচন ঠেকিয়েছে। নিয়মিত বাজার থেকে মাছ কিনে খেতে খেতে হঠাৎ একদিন দেখলাম আমার কোন অসুখ হয় না। এমনকি বাজে চিন্তা করার ইচ্ছা করলেও সেটা করতে পারি না। প্রথমে ভয় পেয়ে ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। বিভিন্ন পরীক্ষায় জানা গেল আমার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গতো বটেই, আমার মগজের চারপাশেও শক্তিশালী পচনরোধী পর্দার জন্ম হয়েছে। তারা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এমনকি অসুস্থ চিন্তাকেও প্রতিরোধ করে এবং এর জন্য দায়ী ফরমালিন’।

বন্ধুটি জানালো, এখন সে ভালো স্বামী- ভালো পিতা। তার হৃদয়ভরা প্রেম, স্নেহ, তার মাথাভরা অপার সৃজনশীলতা- সব এখন টাটকা। ওগুলিতে বিন্দুমাত্র পচনের সম্ভাবনা নেই। ওরা চিরসবুজ, চির কাঁচা। আর সুখ- বন্ধুর মুখের হাসিতেই টের পেলাম তার বাসার আলমারি-ট্রাঙ্ক-ঘটি-বাটি-ডেকচি সব সুখে উপচে পড়ছে। এমন সুখ দেখলে কার না হিংসা লাগে বলুন তো?

বন্ধু শেষ উপদেশ দিল, ‘ প্রাচীন গ্রিক গল্পটা জানোতো? সেই যে নাছোড়বান্দা বুড়াটাকে ঘাড় থেকে নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল হারকিউলিস? সবকিছু নামাও, কিন্তু খবরদার- গ্রিকদের উপদেশ মেনে ফরমালিনকে ঘাড় থেকে নামিও না। তাহলেই তুমি শেষ’।

ইদানিং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খাদ্যে ফরমালিন ব্যবহারের ফলে যে বিষক্রিয়ার জন্ম হয় এবং মানবশরীরের যেসব ক্ষতি হয়- তাদের ফলাও বিবরণে কিছুটা ভারাক্রান্ত হয়েছিলাম। সেইসাথে বকুনি থেকে রেহাইয়ের চেয়েও ব্যবসায়ীদের অসাধুতা আমাকে পীড়া দিচ্ছিল বেশি। এখন বন্ধুর কথা শুনে ভারাক্রান্তকে ভারী তো লাগলোই না বরং একটা নতুন চিন্তা মাথায় এসে ভারটার ওজন বাড়িয়ে দিল আরেকটু।

আমি এখন একটা এনজিও খুলবো আর সমাজ সংস্কারে ফরমালিনকেই বানাবো আমাদের প্রধান অস্ত্র।

লেখক-পরিচিতি:

104483790_10157699662434983_3011008031757481922_n

।অমিতাভ পাল। কবি, গল্পকার, গদ্যকার। জন্ম ১৯৬২। কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা: মিডিয়াকর্মী।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s