প্যারিস রিভিউ, ২৩৭তম সংখ্যা থেকে দুইটা কবিতা :: অমিত চক্রবর্তী

241139039_189234139837329_7297527432886660640_n

বিভিন্ন রোলে অভিনয় করার পারদর্শিতা অজর্ন করাটা সামাজিক জীব হিসাবে  আমাদের প্রধান সোসাইটাল ডিউটি । তারপরও কবিতা—অনুবাদকের ভূমিকায় কম-বেশি সবাই হয়তো প্যারানয়া অনুভব করে। “লস্ট ইন ট্রান্সলেশান” বিষয়টা আর কোনো কিছুর ক্ষেত্রে কবিতার মতো এতো জোরদার না। পেঙ্গুইনের একটা কবিতার অনুবাদ সংকলন দেখতে গিয়ে মজার জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম— ওরা কবিতার ফর্মটা রাখে নাই অনুবাদে। স্রেফ টানা গদ্যে বিষয়বস্তু ন্যারেট করে গ্যাছে। বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং তো অবশ্যই, যদিও তা তর্জমাকারীর নিজস্ব প্রেফারেন্সও হতে পারে। তবে বলতে চাচ্ছি যে, এই ডিলেমাটা ইউনিভার্সাল। কবিতার যে টেক্সচারটা আছে, সেটা কেবল তার “মাতৃ-ভাষায়” সঙ্গত হয়ে ওঠে— অনুবাদে হারায় যায়। এই টেক্সচার খুবই আজব জিনিস, আছে কি নাই আমরা টেরও পাই না, যতক্ষণ না প্লাস্টিকের মোড়ায় বসতে গিয়ে পিছলে পড়ে যাচ্ছি। মানে শুধু বিউটি না, মোড়ায় বসে থাকতে যে ফ্রিকশান’টা দরকার, তা কিন্তু টেক্সচারই দিচ্ছে। ফলত এটাকে কবিতার ফাংশনাল বা মূল জিনিস বলেই ভাবতে পারা দরকার। যাই হোক, এই সমস্যাগুলার কথা মাথায় আসেই, অনুবাদ করার সময়। এবং এটা একনোলেজ করেই অনুবাদের প্রকল্প হাতে নেয়া ভালো বলে মনে হয়।

এইখানে দুইজন কবির কবিতা অনুবাদ করা হয়েছে, প্যারিস রিভিউ এর ২৩৭তম সংখ্যা থেকে। দুইজনই সমসাময়িক মার্কিন কবি। নামের বাইরে আর অন্যান্য তথ্যাদি দেয়া হলো না এইখানে। আগ্রহীরা ইন্টারনেটে খোঁজ-খবর করতে পারবেন অনায়াসে। 

আমি ভুলি নাই :: ডেইজি ফ্রাইড  

আমি ভুলি নাই নেইবার
আমাদের লাল ইটের বাড়ি 
শান্ত, ছোটাখাটো 
যার জানালাগুলা সবসময়ই খোলা 
এমনকি শীতের সময়ও 
আর গর্তে ভরা ম্যাট্রেসে আমাদের গড়াগড়ি
কারো উঠানে একটা মোরগের চিৎকার 
তার হারেমভর্তি অবৈধ মুরগির সামনে 
লর্ডের মত ঘুরতে ঘুরতে... 
আর ঈশ্বরের মতই আমরাও 
নগ্ন হওয়া থামাতে পারি নাই 
অইসব শেষ বিকেলে 
সূর্যের আলোঝরনা কাচের উপর
এসে ভাঙতো তার রঙের গোছাগুলি
যেন অতিকায় এক চোখ
লক্ষ্য করছে আমাদের শান্ত, লম্বা সাপারগুলাকে 
এবং তার প্রতিফলন  মোমালোর মত 
গড়িয়ে পড়ছে 
আমাদের কম দামী টেবিলক্লথের উপর 
তোমার মলিন পাণ্ডুলিপির পাতায়...




পেনিসিলিন এবং এনথ্রোপসিন এপোক্যালিপ্স ::  জর্জ ব্র্যাডলি 

পেনসিলিন আবিষ্কৃত হয়েছিল একটা বাসি পেট্রি-ডিশে 
১৯২৮ সনে এবং চল্লিশ থেকে মোটামুটি মিরাকল ড্রাগ হিসাবে 
চিহ্নিত হয় এবং পঞ্চাশে এটা কম দামী আর সহজলভ্য হয়ে যায় 
যেটা বলতে চাচ্ছি পেনসিলিন সময় মতো আসছিল আমার জন্য, 
যেটা না থাকলে আমি বাচ্চাবস্থায় মারা যাইতাম, একের অধিকবার,
যদিও আশেপাশের জিনিসের মরে যাওয়া দেখার জন্য বেঁচে থাকা
লাগতো না আর। ড্যানিয়েলস লেইনে আমার প্রথম বিড়াল গাড়ির সাথে
বাড়ি খেয়ে মারা গ্যালো। আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর। বাবার আম্মা মারা
গ্যালেন ছয় বছর বয়সে। মায়ের আরো তিন বছর পর। তারপরে গডমাদার।
তারপরে চাচ্চু। তারপরে আমার প্রিয় খালা। তারপরে বন্যার মত আসলো মৃত্যু,
একটা প্রজন্ম মরে গ্যালো দুনিয়ার তালে— বাবা-মা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, তারপর 
একসময় আমার ভাই। দুনিয়া চলছিল দুনিয়ার মতো। কিন্তু এতে বোকা বনার 
কিছু নাই। গ্রীষ্মের বিকেলে আমি যে জোনাকগুলিকে ধরতে পছন্দ করতাম, যারা 
বোতলে বন্দী তারার মত টিপ টিপ করে জ্বলত, তারাও এক সময় জ্বলা বন্ধ
করে দিলো— অনেক বছর হল এদের দেখি না। গিবসন সৈকতের ঢেউগুলিতে 
আগুন জ্বালানো অনুপ্রভ শৈবাল, যারা মধ্যরাতের নগ্ন সাঁতারুদের শরীরে 
তরল শিখার রিবন লাগাতো— হারিয়ে গ্যাছে পৃথিবী থেকে। এখন প্রতিটা সাঁতার 
অন্ধকার। এনট্রেভের গ্ল্যাসিয়ার, যেখানে আমি সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা ঘুরে বেড়াতাম 
একের’পরেক পানশালায় এপারিটিফে চুমুক দিতে দিতে— আধুনিক দুনিয়ার গতিশীল
কায়দায় ঢুকে পড়েছে তার ভ্যালিতে। মাত্র এক দশক, এর মধ্যেই এলপাইন এডেলবিস যত
নাই হয়ে গ্যাছে। পাখি, মৌমাছি, ব্যাঙ, গাছ, প্রবাল, প্রবল মাছেদের ঝাঁক— ছোট অথবা
দানবাকৃতি প্রাণীরা— মিলিয়ে যাচ্ছে এই এনথ্রোপোসিন এপোক্যালিপ্স-এ—
যেটা নিশ্চিত আমাদের স্বাক্ষর,আমাদের চিহ্ন, আমাদের সময়ের ফসিলনিয়তি। 
প্রজন্ম আসে, প্রজন্ম যায়। আর তুমি নিতে পারো না এটা নিজের সাথে। 
কিন্তু আমরা সত্যি চেয়েছি। কী দিয়ে যাবো আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম’কে— 
যেহেতু সূর্য উঠবে, বাতাস বইবে, বয়ে যাবে নদী? 
অপরাধবোধ আর যন্ত্রণা ছাড়া, যার বৈজ্ঞানিক উন্নতি স্রেফ শয়তানের মন্ত্রণা, 
যার প্রতিটা পদক্ষেপ ছিলো অবলিভিয়নের দিকে? বিষাক্ত খুনি আর বিনাশকারী শক্তি 
এই আমাদের জীবন ছিল সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক, দুনিয়ার জন্য। যদিও এটা ছাড়া অন্য 
কোনো জীবন তো সম্ভব ছিল না আমার জন্য, যেই জীবনে কোনো দরকার
থাকতো না অনুশোচনার, যেই জীবনে আমি চিরদিন ইনোসেন্ট থাকতাম। চিরদিন থাকতাম
 শিশু— ব্লেইমলেস আর মৃত।  
        

   


অনুবাদক-পরিচিতি:

1534982_10203636512860175_185431488_o
অমিত চক্রবর্তী। কবি। জন্মঃ ২৯ নভেম্বর, সিলেট। বর্তমান নিবাস যুক্তরাষ্ট্র। পেশায় মোটর প্রকৌশলী। যন্ত্র প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থঃ আন্তোনিয়োর মেঘ (২০১৬) তারাবাক্সে বসে লেখা (২০১৯) মকিংবার্ড (২০২০)। যোগাযোগ: ac05074@gmail.com

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s