গ্রেগরী পার্ডলো’র কবিতা:: অনুবাদ: লায়লা ফারজানা

Gregory-Pardlo-Star-200928sized29

গ্রেগরী পার্ডলো’র জন্ম ১৯৬১ সালের ২৪ নভেম্বর, ফিলাডেলফিয়ায়, কিন্তু বেড়ে ওঠেন নিউ জার্সির উইলিংবোরোতে। ২০০৭ সাথে প্রকাশিত তাঁর ‘টোটেম’ নামক কবিতার বইয়ের জন্য তিনি এপিআর/ হনিকম্যান ফাস্ট বুক প্রাইজ পান এবং ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘ডাইজেস্ট’ নামক কবিতার বইয়ের জন্য পান পুলিৎজার পুরস্কার । ২০১৭ সালে পার্ডলো  গুগেনহাইম ফেলোশিপ-এ ভূষিত হন। বর্তমানে তিনি নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে বসবাস করেন এবং নিউ জার্সির রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে(ক্যামডেন), এমএফএ প্রোগ্রামে শিক্ষকতা করছেন। অতীতে তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর কবিতা পড়তে গিয়ে পাঠক বারেবার হোঁচট খেতে পারেন, কারণ, কবিতার শব্দ নির্বাচন ও বাক্যগঠনে তিনি অত্যন্ত বেপরোয়া, পরিমার্জনায় তেমন আস্থাশীল নন, বরং একেই তিনি তাঁর কবিতার প্রাণ মনে করেন। আরেক বিখ্যাত কবি সাইরাস ক্যাসল্‌স পার্ডলো’র কবিতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, “Pardlo is a modern griot and shape-shifter, a Prospero of unforced allusion: an up-for-anything Pardlo poem can deftly evoke sociology, jazz, lofty philosophy, African-American lit, Russian cinema, Greek mythology, European travel, film noir, hip hop, and a host of other topics.”

নিজে লিখেছেন (Written by Himself)

রাস্তার পাশের একটি রান্নাঘরে 
মুহূর্তের মধ্যে জন্মেছি আমি।
একটি কড়াই ফিসফিস করে 
উচ্চারণ করেছে আমার নাম।

আমার জন্ম বৃষ্টির জল আর ক্ষারে;
নদীর ওপারে যেখানে আমি জন্মেছি—
সেখানে আমাকে ধার করা হয়েছিল
কাপড়ের পিন আর একটি 
জমিতে দেবার মইয়ের সাথে।
আমার জুতার মধ্যে সেলাই করা ছিল 
বিজ্ঞাপনের ব্রডপিস।

তবুও ফিরে এলাম
যদি আপনাদের দয়া হয়, 
যদিও নিজের কোনো দোষ ছাড়াই
কফি গ্রাউন্ড আর ডিমের খোসা দিয়ে 
ভর্তি আমার পকেট।

স্থির, অচল এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন 
হয়ে জন্মেছি আমি
বহন করেছি অপ্রত্যাশিত বোঝা।
আমি জন্ম দিয়েছি, 
আমি আশীর্বাদ দিয়েছি, 
আমি জাগিয়ে তুলেছি সন্দেহ।

আমার জন্ম পরিত্যক্ত বহির্ভাগে, 
উত্তপ্ত বাতাসে, বাতাসে ছিল 
আত্মা আর পুরানো জানালার কম্পন।

আমি জন্মেছি একটি ভগ্নাংশ ও
একটি সংকেত
এবং খতিয়ানের একটি এন্ট্রি হয়ে;
জন্মের সময় আমি ছিলাম—
প্রথম চরণের সূচক।

আমি জন্মেছি এই শীশমহলে—ক্রন্দনরত
কোমর-জলে ডুবে থাকা  একগুঁয়ে হয়ে, 
না একজন নারী, না একজন ভাই হয়ে, 
একটি প্রসঙ্গের প্রস্তাবনা নিয়ে,
মশা আর চোরদের তাড়া খেয়ে, 
বিংশ শতাব্দীর সমস্যা বিলি করতে করতে: 
আমি জন্মগ্রহণ করেছি।
মাছ আর রুটি  চেনার আগেই 
আমি চিনতে পারি মন;
আমার জন্মের আগে 
খানিকটা পথ আমি হেঁটেছি—একা ।


ডাবল-ডাচ (Double Dutch)

মেয়েরা দড়ি লাফাচ্ছে—ডাবল-ডাচ;
বব এণ্ড উইভ ভঙ্গিমায় বক্সারদের মতো 
ঘুষির এপাশ-ওপাশ, 
একে অপরের প্রতিচ্ছায়া ।
যেন স্ল্যাক কর্ড জুড়ে প্রতিপক্ষের লড়াই 
বাতাসে ফেলছে পরাবৃত্তের নোঙর। 

শিশুর হৃদস্পন্দন আর জাম্পারের
কম্পনের মত দ্রুতগতিতে
দড়ি  ঘোরায় তারা, 
যেন কোনো ঘুরন্ত চোখের পলক—
আর মাঝখানে এসে পা ফেলার আগে 
মাথা নাড়ায় সে।
বোধ হয় কিছু জানানোর আছে তার।
স্তম্ভিত যেন সে—
কথা বলার সুযোগের অপেক্ষায়। 

তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে
এক ব্যান্ডলিডারের নেতৃত্ব;
যার ইশারায় কাউন্টিং বন্ধ হতেই
দুলে উঠবে সে উচ্চকিত  স্বরে ।
মধ্য বাতাসের কাল্পনিক সিঁড়িতে পা ফেলে 
ভেসে উঠবে সে মাধ্যাকর্ষণকে উপেক্ষা করে,
যেন চলছে সেই চন্দ্র-মিশনের প্রশিক্ষণ।

একটি বায়বীয় মুহূর্ত;
ততটা দীর্ঘ যতটা যথেষ্ট।
যতটা যথেষ্ট একটি দ্বিতীয় চিন্তাধারাকে
ধারণ করার জন্য,
যেন সে আটকে গেছে এক মাছের চোয়ালে,
যেন চলমান গতিতে, ঘটমান সময়ে—
থমকে যাওয়া এক টাইম-ল্যাপ্স স্থিরচিত্র,
যেন দু’আঙুলের চাপে বন্দী
এক পিষ্ট জীবন। 

মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে,
তার জুতোর সাথে বাঁধা ঘণ্টাগুলি
জাগিয়ে তোলে দেবতাদের—
ধুলোয় মিশে আছে যারা—
যেদিন থেকে ম্যানহাটন ডাচদের দখলে । 

তার নাচের ধরণ যেন এক প্যাটার্ন—
যে প্যাটার্নে  ভারী ধুলায় পথ মেপে 
মৌমাছিরা ফিরে যায়, 
ফিরে আসে মৌচাকে। 
একটি মেয়ে আর দড়ির 
অত্যাশ্চর্য বৈপরীত্য 
যেন প্যাডেল বোটের
নৈকট্য আর দূরত্ব।

তার আদ্র শরীরে আলোর ছটা— 
প্রতিটি সমন্বয় এবং নমনীয়তায়। 
কখনও হেদার বর্ণ, কখনও ঝকমারি, 
এখনই আলো ভেঙে পড়ে তার 
পূর্ণাঙ্গ কব্জির ফালক্রামে 
আবার কখনও আলো নগ্ন কনুই আর
হাঁটুর  জটযুক্ত জয়েন্টগুলিতে,  
উন্মুক্ত পেশীর  সমতলে কখনওবা —
যেন ক্রমাগত ভূমিধ্বস আর পুনঃসংস্কার ।
আস্তিনের মতো
চলমান জলের সূর্য-সুড়সুড়ি।
নিজেকে সাজায় সে নিজ হাতে গড়া
আলো-ছায়া আর মাটির
গয়না, মালা দিয়ে।


রেইজিন(Raisin)

আমার বারো বছরের চাচাতো ভাইকে টেনে নিয়ে গেলাম ব্রডওয়ে প্রডাকশন 'এ রেইজিন ইন দ্যা সান' দেখাতে—কারণ তারকা-ভূমিকায় ছিলেন হিপ-হপ মোগল এবং র‍্যাপিং ব্যাচেলর, ডিডি। একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী র‍্যাপার তাকে দিয়েছিল তার পদবী আর অনিয়মিত চাইল্ড সাপোর্ট, তাই আমি ভেবেছিলাম ছেলেটা রোমাঞ্চিত হবে ওয়াল্টার লি’র মত একজন রক্তমাংসের পপস্টারকে দেখে। আমার বউ তখন নতুন নতুন সন্তানসম্ভবা, আর আমি মহড়া দিচ্ছিলাম ডিডির কথাসাহিত্য আর তার মারাত্মক ব্যক্তিত্ব—আমার ঘরোয়া পারফরম্যান্সের জন্য। আমার চাচাতো ভাই পুরো নাটকটাতেই হাই তুলছিল। শুধু মাত্র ঐ মুহূর্তটুকু ছাড়া, যখন ওয়াল্টার লি’র টুইন ছেলে শক্ত হয়ে গেল মঞ্চে, যেন রুলেট বলের আওয়াজে মোহিত। সবার নিশ্বাস বন্ধ যখন ওয়াল্টার লি টলছিল,অনিশ্চয়তায়, রাগে, ক্ষোভে, সম্পূর্ণ সাদা শহরতলীতে তাদের কেনা বাড়ীটিকে কিনে নেবার লিন্ডনার প্রস্তাবে, হয়ত সে নতজানু হয়ে মেনে নিত সে প্রস্তাব, কিন্তু অনুভব করেছিল ছেলের দৃষ্টিতে উত্তেজনা। আমিও ভাবছিলাম সত্যি, ডিডি হলে কি করত এখানে? 'ধনী হও অথবা চেষ্টা করে মারা যাও', ৫০ সেন্ট আমাদের বলে দেবে। কিন্তু আমার বাবা হলে রিকি স্ক্যাগসের মতো গাইত 'তোমার কিসমিসের উপর উঠো না'—যখন ছোটবেলায় আমি তার চেয়ে বড় মানুষ হওয়ার শপথ করেছিলাম। সেই নিপীড়ক (অত্যাচারী) ফল আমার অহং পরীক্ষা করার জন্য ভারী ওষুধের গোলার মতো পড়ে গেল আমার কোলে আর আমি কল্পনা করেছি বংশপরম্পরা থেকে বংশপরম্পরায়—উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কঙ্গোর কিসমিসের কুচকাওয়াজ—মারভিনের সেই বিখ্যাত গান। বোকা, আমি জানি। থিয়েটারের বাইরে আমার চাচাতো ভাই আমাকে বলেছিল, যখন ডিডির দুই বছর বয়স, তারা তার হস্টলার বাবাকে খুঁজে পেয়েছিল সেন্ট্রাল পার্কে, স্টিয়ারিং হুইলে ঢলে পড়া—তার মাথায় একটি গুলি। আমিও তাকে জানালাম স্বপ্নভঙ্গ আর মারভিন গায়ের কথা। (যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সে তাঁর পুত্রসন্তানকে ভালবাসে কিনা, মারভিন সিনিয়র বলেছিলেন—'শুধুমাত্র বলা যাক আমি তাকে অপছন্দ করতাম না’) একটি জাদু-পর্দা ওঠার প্রত্যাশায় কোটি কোটি ঝলসানো ডায়োডেসর ঝলকের নিচে, টাইমস স্কয়ারে, আমি ছেলেটির পাশে হেঁটেছিলাম, এটা জেনেও যে আমাদের মধ্যে কিন্তু শুধুমাত্র একজনই ধনুক নিতে পারবে।





IMG_7960

কবি লায়লা ফারজানা পেশায় স্থপতি। পাশাপাশি তিনি একজন সংগীতশিল্পী, নাট্যশিল্পী ও চিত্রশিল্পী। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক, ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টো থেকে আরবান ডিজাইন-এ এবং নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবান ডিজাইন ও স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতকোত্তর করেছেন। তিনি নিউ ইয়র্ক সিটি স্কুল কনস্ট্রাকশন অথোরিটিতে স্থপতি হিসাবে কাজ করছেন। এর বাইরেও লায়লা ফারজানা ডিস্টুডিওডি  আর্কিটেক্টস এবং ইঞ্জিনিয়ার্স (দ্য স্টুডিও অফ ডিজাইন)-এর প্রধান।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s