তিনটি প্যারাবল :: ভাষান্তর : বদরুজ্জামান আলমগীর

alamgir

বাইবেলের ল্যুক চ্যাপ্টারে আমরা প্রথম প্যারাবলের দেখা পাই। আদিতে নৈতিকতা শিক্ষা দেবার একধরনের গল্প ছিল প্যারাবল- অনেকটাই ফেবলের জ্ঞাতি ভাই। কালক্রমে প্যারাবল অনেক অদলবদল, অভিজ্ঞান ও দার্শনিক মোকাবেলা সঙ্গে নিয়ে আজ এক পরিপূর্ণ, পরিপক্ক মাধ্যম হিসাবে উঠে এসেছে। শুরুতে প্যারাবল ধর্মীয় নৈয়ায়িকতার নিশ্চিদ্র অঞ্চলে বাস করতো; ফলে তার সঙ্গে থিয়োলজিক্যাল জ্ঞানবত্তার কোনো তফাৎ ছিল না, কিন্তু এখন প্যারাবল প্যারাডক্স ডিল করতে জানে, পলেমিকস আহবান করে, এমনকী ধর্মীয় চৈতন্যের বিপক্ষ দার্শনিক ঘরানা তৈরি করতেও দ্বিধা করে না; সে আজকাল সহসা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকাণ্ড বিনির্মানেও ব্রতী হয়।

নীল নোটবই :: দানিল খার্মস

একসময় একটা লালচুলো লোক ছিল—তার চোখ ছিল না, না ছিল কান। আসলে ওর চুলও ছিল না। কাউকে ডাকার জন্য একটা নাম বসাতে হয়—তাই লোকটির চুল না থাক সত্ত্বেও তাকে লালচুলো নামে ডাকা হতো।

ও কথা বলতে পারতো না, কেননা ওর মুখ ছিল না, এমনকী ছিল না নাকও।

তার পা, কিংবা হাত—কিছুই ছিল না, পাকস্থলী ছিল না, তার পিছন ছিল না, আর পিছন বরাবর ছিল না কোনো মেরুদণ্ড, যে কোনো মানুষের শরীরের ভিতরে আনুষঙ্গিক যা যা থাকে—সেসবও ছিল অনুপস্থিত। ফলে এটা বোঝানো সত্যিই শক্ত—আমরা তাহলে কাকে নিয়ে কথা বলছি।

এমতাবস্থায় বুদ্ধিমানের কাজ হলো—চলুন ওকে নিয়ে কথা না বলি।

.Daniil Kharms : Blue notebook no. 10. Translated from the Russian by George Gibian.

হারানো জিনিস খুঁজে পাওয়ার ম্যাপ :: হুয়ান হোসে এরেওলা

যে লোকটা আমার কাছে তার ম্যাপ বিক্রি করে গেল, সে মোটেও আজগুবি ধরনের কেউ নয়। সাদামাটা অতি চেনাজানা কিসিম—মনে হচ্ছিল একটু শরীর খারাপ, এই যা। হরহামেশাই আমাদের চারদিকে যেমন হকার দেখি— সে তাদের থেকে ব্যতিক্রম কিছু নয়।

সে খুবই কম পয়সায় তার ম্যাপটি ছেড়ে দিতে চাইছিল, মনে হচ্ছিল, একরকম গছিয়ে দিতে পারলেই জানে বাঁচে। তার ম্যাপটি আমাকে সরেজমিনে বুঝিয়ে দেবার কথা বললে আমি প্রস্তাবটি বেশ লুফে নিই, কেননা রোববার আমার ছুটির দিন বলে আমার একেবারে হাতপা ঝাড়া। আমরা একটা ঘুপচি মলিন মতো জায়গায় যাই—যেখানে লোকেরা অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফেলে যায়, আর জিনিসগুলো এতোটাই খারিস্তা ধরনের যে, কেউ তাদের টুকিয়ে নেয় না— যেখানকারটা সেখানেই পড়ে থাকে: ওখানে একটি গোলাপি রঙের চিরুনি পড়ে থাকতে দেখা গেল—তারমধ্যে অনেক ছোট ছোট পাথরদানা লেগে আছে। আমি ডজনখানেক পরিত্যক্ত ঝুমকার সঙ্গে চিরুনিটাও তুলে নিই, কেননা ওটা ছিল একটি চিরুনির চেয়ে বেশি কিছু—কিছু না কিছুর সঙ্গে ওটি আমাকে যুক্ত করে দিচ্ছিল। কিছুটা ভারাক্রান্ত হই আমি—যখনই ভাবি, চিরুনির সঙ্গে আরও যা-কিছু কুড়িয়ে পেয়েছিলাম সেগুলো জমিয়ে রাখিনি— বেঁচেবর্তে থাকার জন্য ন্যূনতম পয়সায় সেগুলো আমি ছেড়ে দিয়েছি। ম্যাপটি কেনার পর থেকে কায়ক্লেশে চলে যাচ্ছে আমার, তার মধ্যে উপরি দেখতে পাচ্ছি—একজন হারিয়ে যাওয়া নারী আচানক কায়দায় আমার সঙ্গে ঠিক ঠিক মানিয়ে নিয়েছে—আশ্চর্য!

Translated from spanish : George Schall.

আমি একদিন বনের ভিতরে গান করেছিলাম :: বব ডিলান

আমি একদিন বনের ভিতরে গান করেছিলাম; পরে একজন বলেছিল—তখন রাত ৩টা বাজে, গানের সময় একটি লম্বা পাড়ায় দাউদাউ আগুন জ্বলে উঠেছিল, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দমকল বাহিনীর তিনজন নির্বাপণকর্মী আগুনে পুড়ে মারা পড়ে, সেইসাথে ৯০জন সাধারণ মানুষও জীবন হারায়—সবই ঘটে রাত ৩টায়।

পরে একইরকম রাত ৩টায় এই গান আবার স্বপ্নে গেয়েছিলাম—একই গান একই সময়ে একই অরণ্যের ভিতরে— এবারও পুরো একপাড়ায় আগুন হিসহিসিয়ে জ্বলে ওঠে। আমার অবশ্য এই পুরো ঘটনাটি ভেঙে ভেঙে বুঝিয়ে বলতে ইচ্ছা করছে না, সবকিছুই বুঝিয়ে বলার দরকার আছে কী! স্বপ্নের বিস্তার ছিল একদম স্বচ্ছ—সেখানে আলো-আঁধারির ধূসরতা ছিল না।

যাপিত জীবনের শাঁসগুলো এভাবেই নানা সময় আমাদের সামনে এসে পুঞ্জীভূত হয়—যেখান থেকে আমরা তার নির্যাসটুকু তুলে আনতে পারি, যে-পথেই অভিজ্ঞতার মজ্জা সংগ্রহ করিনা কেনো, তা থেকেই চলমান মুশকিলগুলো নিয়ন্ত্রণ করি। এটি হতে পারে সংঘাতময় ও অনড়, কিন্তু তারমধ্যেই কোনো একটা অন্তর্গত বিলোড়ন আছে, যেভাবেই হোক বদ্ধাবস্থা নড়ে ওঠে।

আমি জঙ্গলে গান ধরি—মুহূর্তে বরফের ঠাণ্ডায় জমাট বেঁধে উঠি—আমাকে শূন্যে আগলে নেয় কেউ, উড়তে থাকি মাটির উপরে; আমার গানের আগায় যে লোকালয় জ্বলে উঠেছিল, সে-ও নড়ে ওঠে, উড়ে আসে—আমারই দিকে আসতে থাকে—আমি তখনও গান করে যাই, আর আমার দিকে উড়ে আসা বাড়িঘর জ্বলে, তখনও লেলিহান জ্বলে; এবার আমি ও গনগনে আগুনের লোক্কা একদম কাছাকাছি, মুখোমুখি—আমি দুর্নিবার গানের পায়ে বাঁধা, আগুনও প্রজ্জ্বলন বিধির মূলে অসহায়—আমি ও অগ্নিবলয়—এই দুইয়ের কারুর হাতেই কিছু করার অধিকার নেই, যেন আমি জন্মেছি গাইতে, আর অনল এসেছে পুড়তে; তার কারণ, একে কোনো চাক্ষুষতায় বাঁধা যায় না, আমি আর আগুন একদম সামনাসামনি, মুখোমুখি, কিন্তু আমরা পরস্পর একজায়গায় নই—কেবল একটিই আমাদের মধ্যকার অন্তমিল—আমরা একই সময়ে বেঁচে আছি।

আমার নিরেট সামনেই আগুনের হল্কা, পুড়ে যাচ্ছে লোকালয়—আমি তা-ও নৈর্ব্যক্তিক ও নির্দোষ, কেননা আমি আসিনি, নিজে থেকে অগ্নিবলয়ের সামনে আসিনি, আমাকে অন্য কোনো তাতানো আগুনের আঁচ—কিংবা প্রাবল্য উড়িয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। আমি জাস্টিনকে এই পরিপ্রেক্ষিতের কথা জানাই—সে বলে, এমন হতে পারে। কিন্তু আমি জানি, অনেক মানুষ এই ক্ষয়ক্ষতির জন্য আমাকে অভিযুক্ত করবে, বলবে আমিই নাটের গুরু, কিন্তু আমি জানি একের বেশি জায়গায় অবস্থিতি করা আমার সাধ্য ও নাগালের বাইরে, কেবল ঈশ্বরই একসময়ে নানা জায়গায় থাকতে পারেন।

তুমি মানুষ—যেমন খুশি সেভাবেই ভাবতে পারো, কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারো—কিন্তু ব্যাপারটা হাস্যকর। আমি সেই বিকালে লাগামহীন মদ খেয়ে পাঁড় মাতাল হয়ে উঠি—এক অনির্ণেয় ধন্দে পড়ি—কোথাও বোমাবর্ষণ হচ্ছে, লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে সব-দেখি শুচিশুভ্র এক নান-এর মাথাটি গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন ছিটকে পড়ে, কিন্তু আমি তখনও মাতলামির গহবর থেকে বলি—আমার গানের অসহায়তাটুকু কেড়ে নিও না; একা, বিচারবুদ্ধির সীমানাডিঙানো অতল থেকে এই অপরাধ আমি করে যাবো।

I sang in a forest one day.

বদরুজ্জামান আলমগীর: কবি, নাট্যকার, অনুবাদক। জন্মেছেন ভাটি অঞ্চল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে। পড়াশোনা বাজিতপুরে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বহুদিন দেশের বাইরে- যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় থাকেন। বাঙলাদেশে নাটকের দল- গল্প থিয়েটার- এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; নাট্যপত্রের সম্পাদক। নানা পর্যায়ে আরও সম্পাদনা করেছেন- সমাজ ও রাজনীতি, দ্বিতীয়বার, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পূর্ণপথিক, মর্মের বাণী শুনি, অখণ্ডিত। প্যানসিলভেনিয়ায় কবিতার আসর- সংবেদের বাগান-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

প্রকাশিত বই::
আখ্যান নাট্য : নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে। আবের পাঙখা লৈয়া।
প্যারাবল : হৃদপেয়ারার সুবাস।
কবিতা : পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর। নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো। দূরত্বের সুফিয়ানা।
ভাষান্তরিত কবিতা : ঢেউগুলো যমজ বোন।
ছিন্নগদ্য : সঙ্গে প্রাণের খেলা।
প্রকাশিতব্য নিবন্ধ : আশ্চর্য বতুয়া শাক ও কাঁচা দুধের ডিসকোর্স।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s