কমেন্টস অন পোয়েটস :: ইমরুল হাসান

samsur

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লিগাসি

কবিতা কয়েকটা নির্দিষ্ট ছন্দে লিখা যায় না; কবিতা লিখার ভিতরেই অসংখ্য ‘ছন্দ’ থাকে। এই অসংখ্য ছন্দ আবিষ্কার করা যাইতেই পারে। কিন্তু ছন্দের ভিতর দিয়া কবিতা আবিষ্কৃত হবে – রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্বাস, আমার নাই। এই ‘সত্য’ বাঙালি কবিরা যখন ফিল করতে পারবেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতা তখন স্পষ্টভাবে পড়া সম্ভব হবে। কিন্তু যাঁরা ছন্দের ভিতরে কবিতারে আটাইতে চান; তারা কেমনে রবীন্দ্রনাথরে না-পইড়া থাকতে পারেন! একজন কবি খালি নোবেল পুরষ্কার এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সাফল্য পাইছেন বইলা তারে এতোটা ঈর্ষা, অপমান ইত্যাদি করাটা ঠিক না।

২০১৪

ফররুখ আহমেদ

ফররুখ আহমদ বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে বেশ অস্বস্তিকর একটা ঘটনা। প্রথমে উনি আধুনিক কবি আছিলেন; শনিবারের চিঠি’তে উনার কবিতার সমালোচনা করা হইছে, কলকাতার অনেক পত্রিকায় উনার কবিতা ছাপা হইছে এবং উনার লেখালেখির শুরুর সময়টাতে শিখা গোষ্ঠীও উনারে মারাত্মক রকমের প্রেইজ করছেন, আধুনিক কবি বইলা।

কিন্তু ১৯৪৬ এ ‘আজাদ করো পাকিস্তান’ নামে ছোট কবিতার বই ছাপাইয়া উনি এমন একটা জায়াগাতে রিচ করলেন, যেইটারে কলকাতাভিত্তিক বাংলাকবিতাপন্ডিতদের পক্ষে ‘আধুনিক কবিতা’ বইলা মাইনা নেয়াটা একটু মুশকিলেরই হওয়ার কথা। অবশ্য উনি মরার পরে উনার প্রথমজীবনের কবিতা নিয়া বেশ কয়েকটা কবিতার বই ছাপানো হইছে যেইখানে সম্ভবত তার ‘আধুনিক কবি’ ইমেজ আবার কিছুটা রিগেইন করা গেছে।  

আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রথমে তারে ‘ইসলামসচেতন’ কইলেও পরে ‘স্বতন্ত্রসংস্কৃতিসচেতন’ বলছেন। বাংলা-কবিতার ধারায় ফররুখ আহমদ  এখনো একজন ‘স্বতন্ত্র’ বইলাই আল মাহমুদরে অনেকবেশি ‘এসটোনেসিং’ এবং জসীমউদ্দীন’রে (নন-আধুনিক হওয়ার পরেও) ‘জাতীয়’ ধারার কবি মনে হইতে থাকে।

আল মাহমুদের কবিতায় যেইটা ‘পূর্ববঙ্গীয়’ উচ্চারণ / উপাদান/ সাহস/ ড্রিম’, সেইটা ফররুখ আহমদের উপস্থিতি থিকাই ডিরাইভ করা যায়; কিন্তু তারপরও উনারে ‘আধুনিক’ বলতে গেলে অস্বস্তি লাগার মূল কারণ হইলো তিনি ইসলামের পুনরুজ্জীবন চাইছেন, ইকবালের মতো মর্ডান-ইসলামের একটা এসথেটিকস তৈরির চেষ্টা তিনি করছেন বাংলা কবিতায়। নজরুল ইসলাম’রে উনি কখনোই আদর্শ হিসাবে নেন নাই। ধারণা করা যায়, রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তান ব্যর্থ হওয়ার পরে মোর বাঙালি এবং লেস মুসলমানদের কাছে উনার কবিতার চিত্রকল্পগুলি সময়ের সাথে সাথে দূরবর্তী হইতে হইতে একটা সময় ‘স্বতন্ত্র’ হয়া ওঠে! জসীমউদ্দিনের বাংলা-আবিষ্কারে অবশ্য এইসব নিয়া কোন টেনশনই নাই, প্রি-মর্ডান নজরুলীয় সাম্যই এগজিস্ট করতেছে।

২০১৪ 

শামসুর রাহমান

শামসুর রাহমানের সবচে বড় ঝামেলা হইলো, উনি প্রেমের কবিতা লিখতে পারেন নাই। যদিও প্রেমের কবিতা নামে উনার একটা কবিতার বই ছাপা হইছিলো ১৯৮১ সালে। ওইখানে ‘প্রেমের কবিতা’ নামে একটা রাজনৈতিক কবিতা আছে, ওইটা পড়লে হয়তো কিছুটা আন্দাজ করা যায়, কেন উনি প্রেমের কবিতা লিখতে পারেন নাই খুব একটা।উনার রাজনৈতিকতা বা ‘প্রধান কবি’ হওয়ার সেন্স উনার প্রেমের কবিতারে ফ্লারিসড হইতে দেয় নাই। কবিতা লিখতে হইলে বা কবি হইতে হইলে প্রেমের কবিতা লিখতেই হবে – ঘটনা’টা এইরকম না; কিন্তু কবিতা প্রেমের একটা জিনিস, এই পারসেপশন আছে বা কাজ করে তো। উনার সময়ের বা উনার সময়ের পরে আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আবুল হাসান… যাদেরকেই দেখেন, উনাদের রাজনৈতিকতার চাইতে প্রেমের কবিতাগুলাই বেশি মনে থাকে। টেকনিক হিসাবে প্রেমের মধ্যে উনারা রাজনীতি’রে ঢুকায়া দেন নাই, বরং রাজনীতি নিয়া লিখতে গিয়াও ‘প্রেমিক’ হয়া উঠতে চাইছেন উনারা। শামসুর রাহমানে এইটা হইতে পারে নাই। উনি এড়ায়াই চলছেন কিছুটা।

এইভাবে ভাগ করাটাও মেবি ঠিক না – রাজনৈতিক কবিতা, প্রেমের কবিতা; কিন্তু উনার টাইমে এইরকম ভাগ হইছে। উনার রাজনৈতিক কবিতা বইলা একটা বইও আছে মনে হয়। তো, রাজনীতি নিয়া, তত্ত্ব নিয়া কবিতা লেখা যাবে না বা হবে না – এইরকম না বিষয়টা, কিন্তু কবিতা খালি রাজনীতি’র ভোকাল হয়া গেলে কবিতা থাকতে পারে না আর ওইরকম। অথচ দেখেন, প্রেম না হইলেও প্রেমের কবিতা থাইকা যাইতে পারে বা প্রেম থাকে না আসলে, প্রেমের কবিতাই থাকে। (বাজে জিনিসই এইটা, যদি এইরকম হয়।)

অথচ এইটিসের ঢাকার মিডলক্লাসের প্রেমের কবিতা লিখতেই পারতেন উনি! লিখছেনও দুয়েকটা – নম্র, জড়োসড়ো, হাত-ধরাধরি-কইরা-হাঁটতে-চাওয়ার-মতো কবিতা। জেমসের গাওয়া ‘তারায় তারায়…’টা যেইরকম। তো, ওইটা বাদ দিলে উনার একটা প্রেমের কবিতা আমার কিছুটা পছন্দের। আজকে উনার জন্মদিনে আবার মনে করলাম:

পূর্বরাগ

জেনেছি কাকে চাই, কে এলে চোখে ফোটে
নিমেষে শরতের খুশির জ্যোতিকণা;
কাঁপি না ভয়ে আর দ্বিধার নেই দোলা
এবার তবে রাতে হাজার দীপ জ্বেলে
সাজাবো তার পথ যদি সে হেঁটে আসে।
যদি সে হেঁটে আসে, প্রাণের ছায়াপথ
ফুলের মতো ফুটে তারার মতো ফুটে
জ্বলবে সারারাত, ঝরবে সারারাত।
জেনেছি কাকে চাই, বলি না তার নাম
ভিড়ের ত্রিসীমায়; স্বপ্ন-ধ্বনি শুধু
হৃদয়ে বলে নাম, একটি মৃদু নাম।

…  ….  …

*উনার প্রেমের কবিতা নামে বাজে রাজনৈতিক কবিতা’টা।

প্রেমের কবিতা

যখন তোমার সঙ্গে আমার হলো দেখা
লেকের ধারে সঙ্গোপনে,
বিশ্বে তখন মন্দা ভীষণ, রাজায় রাজায়
চলছে লড়াই উলুর বনে।
যখন তোমার পায়রা-হাতে হাতটা ছকে
ডুবে থাকি স্বর্গসুখে,
তখন কোনো গোলটেবিলে দাবার ছকে
শ্বেত পায়রাটা মরছে ধুঁকে।
আমরা যখন ঘড়ির দুটো কাঁটার মতো
মিলি রাতের গভীর যামে,
তখন জানি ইতিহাসের ঘুরছে কাঁটা,
পড়ছে বোমা ভিয়েতনামে।

২০১৮

দুই.

অনেকেই বলেন, শামসুর রাহমান আন্ডাররেটেড কবি, পলিটিক্যাল কারণে উনার নাম এখন নেয়া হয় না। 

পলিটিক্যাল ইস্যুগুলা যে নাই – তা না, এখন দেখবেন আল মাহমুদরে যে গ্রেট কবি মনে হয়, তার একটা কারণ তাে পলিটিক্যালই। এখনকার যেই দমবন্ধ করা পলিটিক্যাল একটা রেজিম আমরা পার করতেছি, সেই অথরিটি যে আল মাহমুদরে নিতে পারে না, সেইটা একভাবে তারে এখনকার রিডারদের কাছাকাছি নিয়া আসে তাে!… তাে, এই পলিটিক্যাল জিনিসগুলারেই সমসাময়িকতার প্রব্লেম বইলা ভাবা যাইতে পারে যেইখানে আর্ট জিনিসটা অনেকটা ধোঁয়াশা বা ব্লার হয়া থাকে। (এই কারণে কবিতারে যে পলিটিক্যাল জায়গা থিকা পড়া যাবে না – তা না; বরং এইভাবে পড়তে পারার প্রব্লেমটারে যে আমরা দেখতে পাইতেছি, সেইটা আর্টরে রিড করার লাইগা যে এনাফ না, সেইটার  কথাই বলে একভাবে।)

কিন্তু এইটা বাদ দিলেই শামসুর রাহমান গ্রেট হয়া উঠবেন বা দরকারি হয়া উঠবেন এইটা আমার মনে হয় না। মেইনলি দুইটা কারণে। এক হইতেছে, আর্ট সবসময়ই একটা ক্লাসের ঘটনা। যেমন ধরেন, বাউল আবদুল করিম, আরবান মিডল ক্লাসের লাইগা গান লেখেন নাই, কিন্তু উনার গান এই ক্লাসের কাছেও পপুলার হইছে। একইরকমভাবে, শামসুর রাহমান কবিতার প্রাইমারি অডিয়েন্স ছিল যেই আরবান কালচারাল মিডল-ক্লাস সেইটা একভাবে তার ক্ষমতা হারাইছে, ভ্যানিশ হয়া যায় নাই ঠিকই, কিন্তু তারা আবার রিভাইব করবে – এইটা আমার মনেহয় না। তাে, এই ক্লাসের বানানাে যেই বাংলাদেশের হিস্ট্রি, সেইটা ফিরা আসার পসিবিলিটি আসলে কম, বা নাই-ই।

তো, ক্লাসটা না থাকলে ক্লাসের আর্টটা থাইকা যাবে না – তা না; অতীতের অনেক সভ্যতা, এমনকি ভাষাই তো শেষ হয়া গেছে, অইগুলা পড়ি না আমরা, এনজয় করি না? এইখানে দুসরা পয়েন্টটা আসে। পলিটিক্যাল এফিলিয়েশনের বাইরেও আর্ট কোন কিছু অফার করতে পারে কিনা? শামসুর রাহমানে এইরকম কোন জায়গা যে নাই – তা না, কিন্তু বেশ কম। উনার একটা ভঙ্গিমা তো খুবই পপুলার হইছিল, ‘স্বাধীনতা তুমি…’ টাইপ। (যদিও এইটা উনার অরিজিনাল আবিষ্কার না, এইটা নিয়া লেখালেখিও হইছে, কিন্তু উনি খুব ভালোভাবে জিনিসটারে আর্টিকুলেট করতে পারছিলেন।) এইগুলা পরে আরো ক্লিশে-ই হয়া গেছে।

আমি যেইটা দেখি, উনার নরোম-সরোম একটা টোন ছিল, কবিতায় কথা বলার। অইটা সুন্দর। অইটাও রিলিভেন্ট না এখন খুব একটা; কিন্তু রিভাইব করার পটেনশিয়াল আছে বইলা আমি দেখি।… মানে, পলিটিক্যাল কারণে উনারে এখন নেয়া যাইতেছে না – এইটা সত্যি, একইভাবে এইটাই সত্যি না যে, পলিটিক্যাল রিজিম চেইঞ্জ হইলেই উনি রিলিভেন্ট হয়া উঠতে পারবেন, গ্রেট হয়া উঠবেন (আবার)।

মানে, পলিটিক্যাল সিচুয়েশনগুলার একটা এফেক্ট কবিতার উপ্রে আছে – এইটা ঠিক, আরো ক্লিয়ারলি বললে, একজন কবি’র পলিটিক্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের একটা ইমপ্যাক্ট তার কবিতার উপ্রে থাকেই; কিন্তু খালি এইটা দিয়া কবিতার রিলিভেন্সের জায়গাটারে বুঝতে গেলে ভুলই হওয়ার কথা আসলে।

২০২০

খাঁটিবাংলাদেশি কবি আল মাহমুদরে নিয়া একটা কথা

আল মাহমুদের কবিতা তো ভালো (মানে, আমি উনার কবিতার একটা ক্রিটিক করতে চাইতেছি আসলে, এইজন্য আগে-ভাগে মাফ চাওয়ার মত বইলা নেয়া যে, উনার কবিতা ‘ভালো’।) কিন্তু উনার কবিতার এস্থেটিক্যাল যেই জায়গা, সেইটাতে আমার না-রাজি’র জায়গা’টা আগেও বলছিলাম মনে হয়; এখন আরেকবার বইলা রাখতে চাইতেছি।

আমার ধারণা, আল মাহমুদ’রে যে কলকাতা-পন্থী এস্থেটিক্সরাও নিতে পারেন, এর একটা মেজর কারণ হইতেছে, বাংলাদেশ’রে ‘গ্রাম-বাংলা’ হিসাবে দেখানোর যে তরিকা, সেইখানে উনার কবিতা খুবই ভালোভাবে ফিট-ইন করতে পারে। মানে, বাংলাদেশে যে গ্রাম-বাংলা নাই – তা তো না; কিন্তু ‘বাংলাদেশ মানেই যে গ্রাম-বাংলা’ – এই নজির হিসাবে উনার কবিতারে অনেক বেশি নেয়া যায়। মানে, ‘আল মাহমুদের কবিতা হইতেছে বাংলাদেশের কবিতা’ – এইরকম স্টেটম্যান্ট পাইবেন। তো, কোন বাংলাদেশ? বা কেমনে বাংলাদেশ? – এই জিনিসগুলা নিয়া ভাবতে গেলে, ব্যাপারটা দেখতে পারাটা আরো ইজি হইতে পারে মনেহয়।

তো, এর এগেনেস্টে শহীদ কাদরী’র ‘শহুরে’ বা শামসুর রাহমানের ‘মফস্বলী’ বা ‘মিডল-ক্লাসে’র ‘বাংলাদেশ’ বেটার – এই কথা আমি বলতে চাইতেছি না। বরং এই যে ‘গ্রাম-বাংলা’রে ‘হাজার বছরের বাংলাদেশের ঐতিহ্য’র গর্তের ভিতরে ফালানোর চেষ্টা, বা এইভাবে রিড করাটারে খুবই বাজে জিনিস বইলা মনে করি। আর এই জিনিস বা এই ‘বাংলাদেশ’ কলকাতার কলোনিয়াল কালচারের বানানো একটা জিনিস।

আল মাহমুদ এই জিনিস জানতেন না – সেইটা আমার মনে হয় না। তখনকার (১৯৬০ – ১৯৮০) ঢাকার পাওয়ারফুল আরবান মিডল-ক্লাসের (যারা আসলে ছিলেন কলোনিয়াল কলকাতার মিনিয়েচার, এখন মারা যাইতেছেন) ভেড়ার দলে না ঢুইকা ‘খাঁটি’ বাংলাদেশি হইতে চাইছেন উনি। উনার এই উদ্দেশ্যরে ‘মহৎ’ বা ‘চালাকি’ ভাবার চাইতে, এইটা যে একটা ‘ট্রাপ’ এই জিনিসটা মনে হয় আমাদের বুঝতে পারাটা দরকার। মানে, ‘গ্রাম-বাংলা’ নিয়া কবিতা লেখা যাবে না – তা না; কিন্তু বাংলাদেশের ‘হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য’ নিয়া কবিতা লেখা বা অই প্যাটার্নটারে গ্লোরিফ্লাই করার আগে, আরেকটু ভাবতে পারা তো দরকার। নাকি না?

মার্চ, ২০২০

উৎপলকুমার বসু

আমার ধারণা, উৎপলকুমার বসু ডিডাক্টিভ পদ্ধতিতে কবিতা লিখতেন; মানে, অনেক কিছু বাদ দিয়াই তো আমরা লিখি; কিন্তু পদ্ধতি হিসাবে উনি এইটা বেশ স্মুথলি ইউজ করতেন; এই জায়গাটা – “বাতাস শান্ত, নীল।” – দেইখা জিনিসটা আরেকবার মনে হইলো; যিনি পড়বেন তিনি কিন্তু বুঝবেন যে, না-থাকা শব্দটা হইতেছে ‘আকাশ’ যেইটা নীল। এই যে বাদ দেয়াগুলি বাদ-ই দেয়া যাইতেছে এবং তারপরে ফিল করা যাইতেছে, এই আনন্দ উনার কবিতা পড়লে পাওয়া যায়।

আরেকটা লাইনের কথা অ্যাড করা যায় এইখানে, ওই যে ‘বাদাম পাহাড়’… “তোমার ব্যক্তিগত বসন্তদিনের চটি হারিয়েছ বাদাম পাহাড়ে”। মানে, পাহাড় তো বাদাম রংয়ের হইতেই পারে, খাগড়াছড়িতে দেখছি এইরকম, ঘাস এবং গাছ-গাছালির ছাল উইঠা যাওয়া পাহাড়। কিন্তু যদি লিখা হইতো, “ব্যক্তিগত বসন্তদিনের চটি আমি হারিয়েছি বাদাম রঙের পাহাড়ে”… কবিতা তো কমতোই, উৎপলকুমার বসু’রেও কি আর তেমন একটা কিছু মনে হইতে পারতো? মানে, আমি ডাউটফুল আর কি।

অক্টোবর, ২০১৫

আবুল হাসান

বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে খ্রিষ্টীয় গত শতকের সেভেনটিইসে যারা কবিতা লিখছেন, অ্যাজ অ্যা টেনডেন্সি তাদের কবিতা সমাজ-রাজনীতির নিচে চাপা পইড়া গেছে বইলা অভিযোগ আছে। অবশ্য সমাজ-রাজনীতি ত প্রায় সবসময়ই আছে কবিতার ভিত্রে, কিন্তু সমাজ-রাজনীতি যেইভাবে চেইঞ্জ হইছে, কবিতাগুলা যেহেতু লেখা হয়া গেছে চেইঞ্জ আর হইতে পারে নাই – এইরকমের একটা ঘটনা ঘটছে। ব্যাড লাক অবশ্যই! 

তবে উনাদের মধ্যে মইরা গিয়া অনেকটাই বাঁইচা আছেন কবি আবুল হাসান। উনি লাকি; কম-বয়স উনার কবিতারে অনেকদিক দিয়াই সেভ কইরা গেছে; পঁচিশ বছর বয়সে এইরকম কবিতাই ত লেখার কথা! আনফরচুনেটলি নির্মলেন্দু গুণ’রে ঊনসত্তর বছর বয়সে এখনো একইরকমের কাজ কইরা যাইতে হইতেছে। মানে, মরার আগ পর্যন্ত উনারা পঁচিশেই থাকবেন, অথবা সত্যিকার অর্থে পঁচিশ বছর বয়সেই উনাদের ক্রিয়েটিভ মৃত্যু সম্ভব হইছে।

মিড এইটিইসে আবৃত্তিচর্চার পেশায় কাঁচামাল হিসাবে অন্যান্য কবিদের পাশাপাশি আবুল হাসানের কবিতার ব্যবহারও সম্ভব হয়; যেই কারণে সাহিত্যসমাজের বাইরে কলেজ-ভার্সিটি’তে পড়া শিক্ষিত সমাজে উনার একটা পরিচিতি তৈরি হয়, কিছু কবিতা সেই  পারসপেক্টিভে জনপ্রিয় হয়।

এমনিতে উনার কবিতা ইনটেন্স, গভীর আবেগের মামলা; ইথিক্যালি প্রগতিশীল মধ্যবিত্তের কালচারাল মেনিফেস্টো এবং এসথেটিক্যালি ছিল বা আছে এক ধরণের আউটস্পোকেননেস-এর চর্চা হিসাবে, যেইটা রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং তসলিমা নাসরীন  হইয়া আর্লি এইটিইস পর্যন্ত কনটিনিউ হইছে। এরপরে বাংলা কবিতা যে কম-কথা-বলা এবং জীবনের-গূঢ়-রহস্য-আবিষ্কারে নামলো সেইটা এই টেনডেন্সির অ্যাবাউট টার্ন হিসাবেও দেখা যাইতে পারে। উনার ইনটেন্সিটির চর্চা এখনো এক ধরণের পুনরাবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যেই আছে।

জানুয়ারি, ২০১৪

আবিদ আজাদ

‘৭০-এ বাংলাদেশে ‘কবিতা’ হয় নাই, শ্লোগান হইছে – এইরকমের একটা প্রপাগান্ডা চালু আছে বাজারে আর আবিদ আজাদ হইতেছেন এর মেইন ভিক্টিম। আবিদ আজাদের কবিতা পড়লে উনার কবিতারে কেন এক রকমের ‘পাতলা’ হিসাবে ট্যাগ দেয়া হইছে সেইটা এক রকম আন্দাজ করা যাইতে পারে। এক হইলো, সংস্কৃত শব্দ বা জিভ দিয়া দাঁত ছুঁইতে হয়, এইরকম ওয়ার্ড অলমোস্ট মিসিং উনার কবিতায়, যেইটারে ‘কবিতা’ বইলা পারসিভ করতে পারি আমরা। দুসরা হইলো, উনার কবিতার জায়গা’টা। আল মাহমুদ যেইভাবে কলকাতার দেখা বাংলাদেশের ‘গ্রাম-বাংলা’রে আপহোল্ড করতে পারছেন বা শহীদ কাদরি ইউরোপিয়ান একটা শহর-ধারণারে, সেইটা কমবেশি মিসিং আবিদ আজাদের কবিতায়; উনি এমন একটা পারসোনালিটি থিকা কথা কইতেছেন, যে কিনা মফস্বল থিকা আসছে, ঢাকা শহরে থাকতেছে আর কলকাতার কোন ড্রিম ছাড়াই (কেমনে পসিবল!)।

কিন্তু আবিদ আজাদ নিজে খুব কনশাস আছিলেন এই জায়গাগুলা নিয়া, এইটা মনেহয় নাই। ‘কবি’ আইডেন্টিটি’টা স্টিল উনার কাছে ‘ফেইলওর’ একটা ঘটনাই; একটা সোসাইটিতে উনি ‘কবি’ হয়াই বাঁচতে চাইছেন আর মরতেও চাইছেন কবি হওয়ার বেনিফিটগুলা নিয়াই।

এপ্রিল, ২০১৯

সিকদার আমিনুল হক

‘রেখো মা দাসেরে মনে’ না লিইখা সিকদার আমিনুল হক (১৯৪২ – ২০০৩) লিখছিলেন ‘রেখো না দাসেরে মনে’ – পরে এইরকম ভুল লিইখা কবিতা বানানোর কাজ অনেকেই করছেন; আগেও কেউ কইরা থাকতে পারেন। কিন্তু সি.আ.হ. যে করছিলেন এইটা মনে করার আর দরকার পড়ে না আসলে; এমনিতেও উনি তো রিকোয়েস্ট করছিলেনই মনে না রাখার জন্য। উনারে এই মনে-না-রাখাটা আসলে উনার জন্যও ভালোই হইছে। এখন অনেকে যাঁরা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতন আধুনিক কবিতা লিখেন উনাদের  শক্তি’রে লুকাইতে হয়, কিন্তু যাঁরা সি.আ.হ.’র মতন কবিতা লেখেন তাদেরকে আর লুকাইতে হয় না, কারণ সি.আ.হ. নিজেই এনাফ লুকানো একটা জিনিস হইতে পারছেন, বাংলা-কবিতায়।

তো, উনারে আবিষ্কার করার কিছু নাই। কবিতায় ‘কিছু জিনিস না-বলা’ রাইখা যারা কবিতা করেন, উনারা দেখলে হয়তো ভাবতে পারবেন যে, আরে এই লোকও দেখি আমাদেরই ফলো করতো! তবে সি.আ.হ.’র একটা জিনিস মে বি ভালো যে, গোপন নিয়া উনি তেমন কোন গোপনীয়তা দেখান নাই।

ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের প্রথম কবিতার বই পাবলিশড হইছে উনার ৫৭ বছর বয়সে। কবিতা লিখতেছেন মনে হয় এর আগে থিকাই। এই পর্যন্ত ছয়টা কবিতার বই ছাপাইছেন, ওই সবগুলি বই মিলায়া ‘কবিতা সংগ্রহ’ নামে বই ছাপানো হইছে ২০১৭-তে। ‘থাড-ওয়ার্ল্ড’ কান্ট্রি’র অ্যাফ্লুয়েন্ট পিপলদের যেই মাইগ্রেটেট ক্লাস ক্রিয়েট হইছে এখন, সেইটার প্রথমদিককার লোক মনে হয় উনি। ধর্মে সেক্যুলার, পিরিতে দেহবাদী। পলিটিক্যালি যেই কারণে সৈয়দ  আলী আহসান’রে কখনো কবি হিসাবে একসেপ্ট করা যায় নাই, একই বিচারে বি.কে.জি.’রেও নিতে পারা’র কথা না। কিন্তু উনার টাইমের ইন্টেলেকচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং উনারে কিছু বেনিফিট দিছে কবি হিসাবে, দেখার আর বলার জায়গাটাতেও। মোর ফ্লুইড হইতে পারছেন। খারাপ হয় নাই ব্যাপারটা।   

অগাস্ট, ২০১৭

রফিক আজাদ

যিনি মারা গেছেন তারে নিয়া সমালোচনার কিছু নাই। যারা বাঁইচা আছেন তাদেরকেও মরণ জিনিসটারে মাইনা নিয়াই বাঁইচা থাকতে হয়। রফিক আজাদের কবিতা বাঁইচা আছে বা থাকবে – এইরকম কথাবার্তা দেখছি, আরো দেখবো – এইরকম আশাও আছে। তো, উনার কবিতা নিয়া বলা যাইতে পারে।

খালি সোসাইটিতে অনেকের কাছে পরিচিত বইলাই একটা কবিতা বা যে কোন ধরণের টেক্সট বা চিন্তা বা আর্ট বাঁইচা থাকে না। মানে, একটা বা অনেকগুলা পারসোনাল এসোসিয়েশন ক্রিয়েট করতে পারাটা তো একটা পদ্ধতি তো অবশ্যই। সোসাইটিতে যারা কবিতা লিখেন এবং পড়েন তারা সবাই আমারে চিনলেন, আর/অথবা যেইসব ইন্সটিটিউশনগুলা এনডোর্স করে আর্ট-কালচারের ঘটনাগুলারে তারা রিকগনাইজ করলেন – এইরকম যোগাযোগের ভিতর দিয়াই জানাশোনার ঘটনাগুলি ঘটে। এইটাই চালু তরিকা। (এই ধরণের ভ্যালু সিস্টেমের এগেনেস্টে আমি না। কোন না কোনভাবে কানেক্টেট তো থাকতেই হয়।) কিন্তু মুশকিল হইলো যে, আপনার বন্ধু-শত্রু বা প্রেমিক-প্রেমিকারা তাদের ফিজিক্যাল এগজিসটেন্সের ভিতর দিয়া আপনার আর্টরে বেশিদিন বাঁচায়া রাখতে পারেন না। (মন-খারাপ করার মতো ব্যাপারই আসলে এইটা।) এইভাবে, পারসোনাল ইমোশনের ভিতর দিয়া করা আর্টের বিচার একটা জেনারেশনের কাছে অনেক কাছের জিনিস হিসাবে থাকে, কারণ ওই আর্টের ভিতর দিয়া যতোটা না আর্ট তার চাইতে বেশি নিজেদের এক্সপেরিয়েন্সগুলারে ফিল করা যায়। এখন আর্ট বইলা যদি কিছু থাকে সেইটা এই পারসোনাল এক্সপেরিয়েন্সের বাইরের কোন ঘটনাই হওয়ার কথা।

আপনারে চিনি বইলাই আপনার কবিতা আমি ভালোবাসি না; আপনারে না চিইনাও আপনার কবিতা আমি ভালোবাসতে পারতেছি – এইটা আর পসিবল হইতে পারে না তখন। আপনারে চিনা’টা জরুরি। আপনার লেখা দিয়া আপনারে চিনতে পারতেছি না আমি। টেক্সট দিয়া লাইফটা ক্রিয়েট হইতেছে না, বরং আপনার লাইফ দিয়া আপনার কবিতারে বোঝা লাগতেছে আমার। এই বিচার জরুরি রফিক আজাদের কবিতার লাইগা। কিন্তু লাইফের আসলে এত ঠেকা পড়ে না। এই কারণে এখন বা বেশকিছু বছর পরে উনার কবিতা না পড়লেও কেউ তেমন কোনকিছু মিস করবেন বইলা মনেহয় না। অবশ্য উনারে তো ঢাকার কবি-সমাজ মিস করতেছেন, সাকুরার টেবিল চেয়ারগুলাও মিস করবো বইলাই ভাবা যায়।

২০১৬

মহাদেব সাহার কবিতা কেন রিলিভেন্ট হইতে পারে না এখন?

কবি মহাদেব সাহা’র কথা মনে আছে তো আপনাদের? উনি বাঁইচা আছেন এখনো। বাংলা একাডেমি পুরষ্কার, একুশে পদক… মানে, অই সময়ের যতো ‘প্রেস্টিজিয়াস’  প্রাইজ আছে মোটামুটি সবগুলাই পাইছেন। ১১টা কবিতার বাছাই  (কাব্য সমগ্র, শ্রেষ্ঠ কবিতা, রাজনৈতিক কবিতা, প্রেমের কবিতা…) বাদেই ৬৩টা কবিতার বই ছাপাইছেন। (বেশি লেখাটা অবশ্যই খারাপ কোন জিনিস না।)

উনার প্রথম দিকের কবিতার বইগুলা, যেমন, এই গৃহ, এই সন্ন্যাস (১৯৭২), কী সুন্দর অন্ধ (১৯৭৮) লাজুক লিরিক (১৯৮৪) ‘তরুণ কবি’ হিসাবে আমাদের ‘পাঠ্য’ আছিল, ১৯৯০’র দিকে। ফার্স্ট গ্রেডের কবি হিসাবে শামসুর রহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী – এই তিনজনের মধ্যে ‘ফাইট’ চললেও এর পরে রফিক আজাদসহ আরো কয়েকজনের লগে মহাদেব সাহার নামও আসতো। মানে, সিরিয়ালে “প্রথম ১০ জন” কবির মধ্যে উনার নাম তো ছিলই। ইভেন সিকদার আমিনুল হকের আগে উনার নাম ছিল। মুস্তফা আনোয়ারের নাম তো এখনো না নেয়ারই নিয়ম। এইরকম।

কিন্তু উনি হেলাল হাফিজের মতন এতোটা ‘শস্তা’-ও ছিলেন না। সিরিয়াস কবি-ই ছিলেন। ১৯৮০/৯০-এ কবিতা আবৃত্তির ক্যাসেটে উনার কবিতা দুয়েকটা থাকতোই। নিচে একটা কবিতা দিতেছি; পইড়া দেখেন, পানির উপ্রে ভাসতে থাকা তেলের মতন তেলতেলানি প্রেম জাইগা উঠতে পারবে এখনো অনেকের। আমি মোটামুটি শিওর!

চিঠি দিও

করুণা করে হলে চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও
আঙুলের মিহিন সেলাই
ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।
চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও
সমুদ্র বোঝাতে চাও, মেঘ চাও, ফুল, পাখি, সবুজ পাহাড়
বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখর মতো চিহ্ন কিছু দিও!
আজো তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি
আসবেন অচেনা রাজার লোক
তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে।
এক কোণে শীতের শিশির দিও একফোঁটা, সেন্টের শিশির চেয়ে
তৃণমূল থেকে তোলা ঘ্রাণ
এমন ব্যস্ততা যদি শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো, তোমার কুশল!
ওই তো রাজার লোক যায় ক্যাম্বিসের জুতো পায়ে,কাঁধে ব্যাগ,
হাতে কাগজের একগুচ্ছ জীজন ফ্লাওয়ার
কারো কৃষ্ণচূড়া, কারো উদাসীন উইলোর ঝোপ, কারো নিবিড় বকুল
এর কিছুই আমার নয় আমি অকারণ
হাওয়ায় চিৎকার তুলে বলি, আমার কি কোনো কিছু নাই?
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, ভুলে গিয়ে ভুল করে একখানি চিঠি
দিও খামে
কিছুই লেখার নেই তবু লিখো একটি পাখির শিস
একটি ফুলের ছোটো নাম,
টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে কিছু হয়তো পাওনি খুঁজে
সেইসব চুপচাপ কোনো দুপুরবেলার গল্প
খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড়ো একা লাগে, তাই লিখো
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, মিথ্যা করে হলে বলো, ভালোবাসি।

(কী সুন্দর অন্ধ, ১৯৭৮)

২.

উনারে পারসোনালিও দেখছি আমি। ইয়া লম্বা, ঠ্যাঙা, চিকনা। উনার পোলা আমাদের লগে ঢাকা কলেজে পড়তো। পোলারে মেবি উনি অনেক ভালোবাসতেন। পোলারে কলেজ থিকা নিয়া যাওয়ার জন্য আসতেন। কাঁধে চটের ব্যাগ। পাঞ্জাবি পরা। খুবই গম্ভীর। মানে, দেখলেই বোঝা যাইতো, উনি কবি! উনার পোলার ফ্রেন্ডরাও পোলারে খেপাইতো মনে হয়। উনারে টিটকারি মারতো, দেখ, কবি আইছে একটা! মানে, খালি কবিতা লেখা-ই না, একটা কবি-জীবনও উনি কাটাইছেন মনেহয়।

তারপরেও এখনকার সময়ে যারা কবিতা লেখেন বাংলা-ভাষায় তাদের কাছে উনার কবিতা আর রিলিভেন্ট না। মানে, উনার কবিতা না পড়লেও চলে। ফেসবুকে তো শ’খানেক কবি আছেন আমার লিস্টে নিউজফিডে যাদের কথা-বার্তা চোখে পড়ে। কতো কতো পত্রিকা, ওয়েব-সাহিত্য এখনো তো ছাপা হয়, উনার জন্মদিনে নিউজও হয় মনে হয়। কিন্তু গত ৮/১০ বছরে উনার কবিতা নিয়া কোন সিগনিফিকেন্ট কথা-বার্তা, ভালো-খারাপ কোন কিছু দেখছি বইলা মনে পড়ে না।

তো, একসময়ের ‘তুমুল জনপ্রিয়’ (মানে, মিডিয়াবাজি শব্দ এইটা, আসলে তা না) কবি হঠাৎ কইরা গায়েব হয়া গেলেন, ইরিলিভেন্ট হয়া পড়ছেন অনেকটাই, বাংলা-কবিতাতে। কেন?

৩.

রফিক আজাদ মারা যাওয়ার পরে লিখছিলাম, কবিতা যা-ই লেখেন, এক ধরণের ‘কবিতা সংগঠন’ বা ‘সম্পাদক, সাংবাদিক’ হওয়ার ভিতর দিয়া উনারা রিলিভেন্ট ছিলেন; মানে, সাহিত্য সার্কেলের বা আরো স্পষ্ট কইরা বললে, সিন্ডিকেটের লোক ছিলেন। সাহিত্যের এই সিন্ডিকেশন সবসময়ই থাকে, কম-বেশি। কিন্তু অই সিন্ডিকেশনটা একটা সময়ে কবিতার একটা ‘রুচি’ বা ‘ফ্যাশন’ তৈরি করতে পারে অবশ্যই, কিন্তু সময় গেলে টের পাওয়া যায়, এইগুলা কবিতার বাইরেরই জিনিস। মানে, রফিক আজাদ কবি ছিলেন না, উনার কবিতা হয় নাই – এইগুলা আমার কথা না; উনি যে বাঁইচা থাকার সময়ে অনেকদিন ‘পাওয়ারফুল কবি’ ছিলেন, সেইটা যতোটা না কবিতার ঘটনা ছিল, তার চাইতে বেশি ছিল আসলে উনার সোশ্যাল রিগকনিশনের জায়গা, ‘সামাজিক প্রতিপত্তি’র ঘটনা।

মহাদেব সাহাও অই সময়ের ঢাকার কবিতার সার্কেলের বা সিন্ডিকেটেরই লোক ছিলেন, কিন্তু অইটা উনার স্ট্রেংথের জায়গা ছিল কিনা আমি শিওর না। উনি বরং অই ‘কবিতা রুচি’র জায়গা থিকা পাবলিকের যেই ডিমান্ড, এক্সপেক্টশন কবিতার কাছে, সেইটার কাছে একটা প্যাটার্নের ভিতর দিয়া সারেন্ডার করতে পারছিলেন।

মানে, ব্যাপারটা এইরকম না যে, প্রেমের কবিতা লেখা যাবে না কিন্তু যে কোন আর্ট যখন একটা ফরম্যাট বা প্যাটার্নের কাছে সারেন্ডার করে, তখন সেইটা নিজে নিজেই মারা যাইতে পারে। কারণ কবিতা বা যে কোন আর্ট বা ক্রিয়েটিভিটি হইতেছে যতোটা না অভ্যাস তার চাইতে একটা এক্সপ্লোরেশনের ঘটনা।

আপনি খালি কবিতা-ই লিখতেছেন না বা কবিতা বইলা যে একটা কিছুরে ধইরা নেয়া হয় তারেই রিপ্রডিউস করতে থাকাটাই কবিতার ঘটনা না।… তো, কোন জিনিস কবিতা – সেইটা ডিফাইন করার কিছু নাই, বরং কোন জিনিস কেন কবিতা না, সেইটা বুঝতে পারা যায়। মহাদেব সাহা’র কবিতাতে এইরকম ছড়ায়া যাওয়া বা এক্সপ্লোরেশনের ঘটনা নাই বা খুব কম। অল্প কিছু কবিতা পড়লেই ক্লান্ত হয়া যাইতে পারবেন। এই কারণে না যে, উনি একই রকমের জিনিস নিয়া কবিতা লিখছেন, বরং একই রকমের কবিতার মধ্যে উনি আটকায়া আছেন।

সাবধান বাণী হিসাবে একটা কথা বইলা রাখা যাইতে পারে, সব গ্রেট আর্ট বা আর্টিস্টেরই একটা প্যাটার্ন থাকে। জীবনানন্দ দাশও দেখবেন একটা প্যাটার্নেই লিখছেন, অই এক পয়ারের ছন্দই। আর যেহেতু পয়ারের ছন্দটা পুঁথি’র অনেক কাছাকাছি পড়তে সহজ হয়; এইরকম কিছু টেকনিকের ব্যাপারও কাজ করে। (এই টেকনিকগুলা হেল্প করে, কিন্তু এইগুলাই কবিতা না।) বা দেখবেন, আল মাহমুদও দেখবেন অই এক গ্রাম-বাংলা নিয়াই আছেন।… যে কোন কবি বা রাইটারের কথাই যদি ধরেন, দেখবেন কোন একটা সেন্ট্রাল জিনিস নিয়াই উনারা চিন্তিত। তো, চিন্তার জায়গাটা উনাদের আর্টরে গ্রেট বানায় না আসলে, বা রিডারদের ‘রুচি’রে স্যাটিসফাই করতে পারাটা। আমার ধারণা, মহাদেব সাহা এই কাজটা করছিলেন। একটা সময়ের এক ধরণের রিডারদেরকে স্যাটিসফাই করতে পারছিলেন।

আমরা তো অবশ্যই চাই আমাদের লেখা সবাই না হইলেও, অনেকে না হইলেও কেউ না কেউ পছন্দ করুক। এইটা এক্সপেক্টশন হিসাবে বাজে না। কিন্তু কবিতারে অইখানে আটকায়া রাখলে মুশকিল আর কি!…

জানুয়ারি, ২০২১

সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ হক মারা যাওয়ার পরে এইটা ভাবছিলাম – উনি যেই ফর্মে গ্রেটার অডিয়েন্সের কথা ভাবতে পারছেন সেই ফর্মে উনার আর্ট ততো বেটার হইছে। উনার সিনেমার স্ক্রিপ্ট, গানের লিরিকস সবচে বেটার, তারপরে উনার নাটক, তারপরে গল্প-উপন্যাস আর সবচে শ্যালো হইতেছে উনার কবিতা। এখন এই বেটার বা শ্যালো বলার পিছনে দুইটা ব্যাপারই আছে – হরাইজেন্টালি স্প্রেডেড হইছে খালি – তা না, যে প্রচুর পাবলিকে দেখছে বা পড়ছে; ভার্টিক্যালি ডিপ বা এক্সপোজডও হইতে পারছে, একসাথে অনেক অডিয়েন্সের ভিতরে ‘কমন’ একটা কিছুরে বাইর করার ট্রাই করতে হইছে – এইরকম হইতে পারে।

হইছে কি হয় নাই – সেইটার চাইতেও এই যে ‘কমন’ একটা কিছুরে লোকেট করতে চাওয়া, ফর্মের কারণেই, এক ধরণের এক্সপ্লোরেশন পসিবল হইছে, উনার ক্ষেত্রে। মেবি কবিতারে অল্প কিছু লোকের আর্ট বইলাই ভাবছেন উনি।…

২.

তারপরও সৈয়দ হক’রে কবি বলাটা আসলে উনারে এক ধরণের সম্মান দেখানোই। মরা-মানুশরে সম্মান দিতে চাই আমরা। জীবতদেরকেও। কিন্তু উনি কেন কবিতা লিখতে পারেন নাই, সেইটা বুঝতে পারলেও মনে হয় সুবিধা হবে, যেইভাবে উনি ‘তরুণ’ কবিদের বিশ বছর সময় বাঁচাইয়া দিছিলেন [ক্লেইমটা উনি করতেই পারেন], এইরকম কারো কারো লাইফও বাঁচতে পারে।

‘মার্জিনে মন্তব্য’ বইটাতে উনি যে টেকনিক নিয়া কথা বলতে পারছেন, এইটা মেবি উনার স্মার্টনেস নিয়া এক ধরণের কনফিডেন্সের কারণেই। টেকনিকগুলা নিয়া তো কথা বলেন না অনেকে, ধরা খাওয়ার চান্স থাকে। টেকনিকগুলাই কবিতা না, কিন্তু বলাটা নিয়া আমাদের যে অস্বস্তি সেইটাও কোন কাজের জিনিস না; চেষ্টা করা যাইতেই পারে। তো, উনি বলতেছিলেন, শব্দ, ভাষা এইসব জিনিস নিয়া… যে, ডেইলি লাইফের ভাষা থিকা আলাদা হইতে হয় কবিতার ভাষা; মানে, একই শব্দ ইউজ করেন কবি’রা কিন্তু মিনিং একইরকম থাকে না। সাজ্জাদ শরিফও এইরকম কইছিলেন [মনে হয়], আরেকটু ঘুরাইয়া; যে, শব্দরে বাঁকাইয়া দিতে হয়। এইগুলা বাজে কথা। মিনিং যে পাল্টাইয়া যায়, অর্থ যে বাঁইকা যায়, এইটা কবিতার সমস্যা, কেরামতি না। হক সাহেব ব্যাপারগুলা জানতেন, কিন্তু ইন্টারপ্রেট করছেন ভুলভাবে। জানা আর বুঝতে পারা ব্যাপারটা এক না।

তো, মাঝে-মধ্যে যখন উনার বুঝার বাইরে গিয়া লিখতে পারছেন, যেমন সিনেমার গানগুলা, দেখবেন ওইগুলিই এখন থাকতেছে।

সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ইমতিয়াজ মাহমুদ

ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতা আমি ফেসবুকেই পড়ছি। আমার ফেসবুক-ফ্রেন্ডদের অনেকেই উনার কবিতা শেয়ার দেন, তখন পড়া হইছে। উনার সাথে আমার ফেসবুকের ফ্রেন্ডশীপ নাই, ছিল মনে হয় কোনসময়, বা এখনো থাকলেও উনার পোস্ট আমার নিউজফিডে আসে না। উনার কবিতা তো আছেই, কবিতার বাইরে এই আলাপগুলাও আছে উনারে নিয়া যে, উনি জনপ্রিয় কবি। মানে, একজন কবি দুই-তিন হাজার লাইক পান ফেসবুকে, এইটা তো বড় ব্যাপারই।

তো, উনি জনপ্রিয় বইলাই ‘খারাপ কবি’ – তা তো না; কিন্তু এর একটা প্রেশার উনি নেন মনে হয়। একজন পারফর্মারের জন্য এই এটেনশনটা খালি দরকারই না, বরং জরুরি একটা জিনিস, তার কাজের রিকগনিশন এইটা; কিন্তু একজন কবি’র জন্য ঘটনা’টা একই রকম না।

একজন কবি’র ইচ্ছার মধ্যে এইটা তো থাকেই যে, তার কবিতা সবাই পছন্দ না করলেও, উনি যাদের জন্য লেখেন বা যাদেরকে লাইক করেন, ইম্পর্টেন্ট মনে করেন, তারা উনার কবিতা লাইক করবে; কিন্তু এই এক্সপেক্টশনটার ভিতর কনজিউমড হয়া যাওয়াটা ঠিক না।… তো, ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতা নিয়া ঢাকার ‘সিরিয়াস কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদক’রা’ এতোটা ‘উচ্ছ্বসিত’ না, আর এইখানে ‘জেলাসি’র কিছু কন্ট্রিবিউশন তো থাকারই কথা। কারণ উনার কবিতা ‘খারাপ’- এই কথাও কেউ বলেন না; বলেন, পপুলার! 

এইরকম ‘ভালো’ কবি’র বাইরে ‘পপুলার কবি’ও বাংলা-সাহিত্যে আছেন বা ছিলেন; নাম হিসাবে, হেলাল হাফিজ, মহাদেব সাহা’র নাম মনে হইলো; মানে, উনারা যতোটা না ‘ভালো’ কবি, তার চাইতে ‘পপুলার কবি’ (ইভেন পপুলার না হইতে পারলেও)। তো, ইমতিয়াজ মাহমুদ এইরকম ‘পপুলার কবি’ হইতে চান – এইরকম আমার মনে হয় নাই, কিন্তু উনি এই রেইসটার মধ্যে ঢুকে গেছেন বা আছেন… (এইটা খারাপ বা ভালো, সেইটা পরের কথা)

বাংলা-কবিতায় উনার সিগনিফিকেন্স আমার কাছে মনে হইছে যে, উনি কয়টা ফর্ম বা প্যাটার্নরে ‘কবিতা’ হিসাবে এস্টাবলিশ করাইতে পারতেছেন। এইরকম না যে, এই ফর্মগুলা উনিই শুরু করছেন, বরং অই ফর্মগুলাতে ভালো পারফর্ম করতে পারছেন।

একটা সময়ে খেয়াল করলে দেখবেন মিডল-ক্লাসের ভিতরে শামসুর রাহমানের মতন কবিতা-লেখার ব্যাপার ছিল। (আল-মাহমুদের মতন লেখার চলও হইছে এখন।) প্যাটার্নগুলা কোন কোন সময় এতোটাই সরল যে, আপনি বুঝতে পারবেন, যেমন একটা ছিল “স্বাধীনতা তুমি” টাইপ; এইরকম ইমতিয়াজ মাহমুদের একটা টাইপ হইতেছে “দুই-লাইনে ছন্দ-মিল দিয়া” লেখাটা (এইরকম আরো কিছু টাইপ আছে মেবি…); এখন এইরকম লিখলেই মনে হবে – ‘কবিতা’! 

এইরকম কবিতার ফরম্যাটের বাজে দিক হইলো, একটা সময়ে অনেক সময় কিছু বলতে পারবেন আপনি ফরম্যাটগুলাতে; কিন্তু যতো কপি হইতে থাকবে, ততো ময়লা হইতে থাকবে, ফেড হইতে থাকবে, কবিতা হিসাবে। এখন শামসুর রাহমানের অই ফরম্যাট দেখবেন আর কাজ করে না, ‘কবিতা’ মনে হইতে পারে না।… কিন্তু এই ফরম্যাটের বাইরে যে শামসুর রাহমানের কোন কবিতা নাই বা ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতা নাই – তা না, কিন্তু এইভাবে পারসিভড হওয়াটা মেবি কবি হিসাবে ‘সাকসেসফুল’ হওয়ার ব্যাডলাক একটা 

তো, শুরুতেই যেইটা বলতেছিলাম, উনার খুববেশি কবিতা আমি পড়ি নাই, কিন্তু পড়ার ইচ্ছা আছে; মাঝখানে ভাবছিলামও উনার বইগুলা কিনবো, কিনা হয় নাই আর; কিন্তু কিনবো হয়তো, তখন যদি পড়া হয় উনার কবিতা নিয়া আরো দুয়েক কথা বলার ইচ্ছা থাকলো।… 

ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ইমরুল হাসান। কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম: ১৯৭৫। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s